দৈনন্দিন জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তিন ধরনের হতে পারে:
১/ এ শ্রেণিভুক্ত হচ্ছে সেসব বিষয় যেগুলো স্বল্প পরিমাণে হলে চমৎকার;
২/ এ শ্রেণিভুক্ত হচ্ছে সেসব বিষয় যেগুলো অধিক পরিমাণে হলে উত্তম;
৩/ এ শ্রেণিভুক্ত বিষয় পরিস্থিতি অনুযায়ী তারতম্য হয়।
শরীয়ত ও প্রথা উভয় অনুযায়ী যে ধরনের বিষয় যে কোনো পরিস্থিতিতে স্বল্প পরিমাণে উত্তম ও প্রশংসনীয় বলে সর্বসম্মতভাবে বিবেচিত, তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পানাহারের মতো ব্যাপার। আরবীয় জনগণ ও জ্ঞানী-গুণীজন সবাই এগুলোর স্বল্প পরিমাণ ব্যবহারের প্রশংসা ও অধিক ব্যবহারের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন; কেননা অধিক পানাহার লোভ, লালসা, লোলুপতা ও খাদ্য-লিপ্সা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ইঙ্গিতবহ। সেটা ইহ ও পরকালীন জগতে ক্ষতিকর ফলাফল বয়ে আনে। শারীরিক অসুখ-বিসুখ, আত্মিক নিকৃষ্টতা ও মেধাশূন্যতা-ও নিয়ে আসে। এর স্বল্প পরিমাণ ব্যবহার তুষ্টি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিফলন করে। বস্তুতঃ খিদের নিয়ন্ত্রণ দ্বারা স্বাস্থ্য, স্পষ্ট বা পরিষ্কার চিন্তা ও তীক্ষ্ণ ধীশক্তি অর্জিত হয়।
একই কথা প্রযোজ্য বেশি মাত্রায় ঘুমের বেলায়ও। এটা (শারীরিক ও মানসিক) দুর্বলতা ও মেধাহীনতা এবং অবিচক্ষণতার ইঙ্গিতবহ। এর ফলশ্রুতিতে দেখা দেয় অলসতা, ব্যর্থতার অভ্যেস, উপকারী নয় এমন সব বিষয়ে জীবন উদ্দেশ্যবিহীনভাবে বরবাদ করা, হৃদয়ের কাঠিন্য, আর অন্তরের প্রতি অবহেলা ও সেটার অপমৃত্যু-ও। এর প্রমাণ সর্বজনবিদিত, (সবারই) প্রত্যক্ষকৃত এবং পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠী (কওম) ও অতীতকালের জ্ঞানী-গুণীজন কর্তৃক তা বর্ণিত, বিশেষ করে আরবীয়দের কাব্যে ও তাঁদেরই নানা কাহিনীতে। এগুলো আরো পাওয়া যায় সহীহ হাদীস ও সালাফ-বৃন্দের রেওয়ায়াত তথা বর্ণনায়, আর তাঁদের পরে আগত (খালাফ)-দের বিবরণেও, যেগুলো সম্পর্কে উদ্ধৃতি দেয়া নিষ্প্রয়োজন। আমরা এখানে সেগুলোর পূর্ণ বিবরণ লিপিবদ্ধ করবো না, বরং শুধু সারাংশ-ই পেশ করবো; কেননা তাতে নিহিত জ্ঞান সর্বজনজ্ঞাত।
ওপরোক্ত দুটো বিষয়ে (অতিভোজন ও অধিক ঘুমের ব্যাপারে) মহানবী (ﷺ)-ই সবার চেয়ে সংযমী; এই বাস্তবতা তাঁরই প্রসিদ্ধ জীবনী হতে জানা যায়। তিনি মানুষজনকে আদেশ দিতেন ও উৎসাহিত করতেন যাতে তাঁরা সেগুলোর স্বল্প পরিমাণ ব্যবহার করেন; আর এই দুটো বিষয়কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংযুক্ত-ও করে দিয়েছিলেন।
❏ আল-মিকদাম আল-মা’দিকারিব (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন হুযূর পূর নূর (ﷺ)-এর হাদীস, যিনি বলেন: “বনী আদম (আদম-সন্তান) তার পেটের চেয়ে মন্দ আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। আদম-পুত্রের মেরুদণ্ড সোজা রাখার (মানে জীবন ধারণের) জন্যে কয়েক গ্রাস খাবার-ই যথেষ্ট। যদি (বেশি) হতেই হয়, তবে তার খাবারের জন্যে এক-তৃতীয়াংশ, পানীয়ের জন্যে এক-তৃতীয়াংশ এবং নিঃশ্বাসের জন্যে এক-তৃতীয়াংশ (বরাদ্দ)” [আত্ তিরমিযী, আন্ নাসাঈ ও ইবনে হিব্বান]। কেননা, অতিরিক্ত খাবার অতিরিক্ত ঘুমের কারণ হয়।
❏ হযরত সুফিয়ান সাওরী (رحمة الله) বলেন, “স্বল্প আহারে কেউ রাত জাগতে সক্ষম।”
❏ জনৈক সালাফ বলেন, “এতো বেশি খেয়ো না যার দরুন তোমাদের বেশি পান করতে হয়, আর বেশি নিদ্রাও যাপন করতে হয়, আর অনেক বেশি পরিমাণে হারাতেও হয়।”
❏ বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ ফরমান, “আমি ওই ধরনের খাবার পছন্দ করি যা’তে রয়েছে অনেক হাত” (মানে বেশি মানুষ ওই খাবার গ্রহণ করে, আর তারা অল্প খাওয়ার দরুন তাতে বরকত লাভ হয়)। [সর্ব-হযরত আনাস (رضي الله عنه) ও জাবের (رضي الله عنه) হতে সকল হাদীসবেত্তা]
❏ হযরত মা আয়েশা (رضي الله عنه) বলেন, “রাসূলে পাক (ﷺ) কখনোই পেট ভরে খেতেন না। পরিবারের সাথে থাকাকালে তিনি তাদের কাছে খাবার চাইতেন না। তাঁরা তাঁকে খাওয়ালে তিনি খেতেন। তাঁরা যা খাদ্য পরিবেশন করতেন, তা-ই খেতেন, আর যা পানীয় হিসেবে দিতেন, তা-ই পান করতেন।”
❏ এটা বারিরা (رضي الله عنه) বর্ণিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, যেখানে মহানবী (ﷺ) বলেন, “আমি কি গোশতের একটি পাত্র দেখিনি?”
[মুসলিম ও আল-বোখারী। বারিরা (رضي الله عنه) যে মাংস রান্না করছিলেন, তার বৈধতা প্রমাণের উদ্দেশ্যেই এ কথা বলা হয়েছিল]
এটা সম্ভব যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই ক্ষেত্রে জিজ্ঞেস করার কারণ হতে পারে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁদের মনের কথা এই মর্মে যে ওই গোস্ত তাঁর জন্যে বৈধ নয়; এমতাবস্থায় তিনি সুন্নাতকে স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। তাঁকে তাঁরা কোনো মাংস পরিবেশন না করতে দেখে, যদিও তাঁরা নিজেদেরকে তাঁর চেয়ে এর প্রতি বেশি হক্কদার বিবেচনা করেননি, তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে তাঁর ভাবনা সত্য/সঠিক কি না, আর তিনি তাঁদের কাছেও ব্যাপারটি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন এই বলে, “এটা তার (বারিরা’র) জন্যে সাদাকাহ এবং আমাদের জন্যে পুরস্কার।”
❏ লোকমান (عليه السلام)-এর পুত্রের প্রতি তাঁর জ্ঞানগর্ভ পরামর্শ ছিল এরকম – “হে পুত্র, উদরপূর্তি হলে চিন্তাশক্তি লোপ পায়, জ্ঞান স্থবির হয়ে যায়, আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবাদত-বন্দেগীতে ব্যর্থ হয়।”
❏ সাহনূন বলেন, “যে ব্যক্তি উদরপূর্তি করে খায়, তার জন্যে জ্ঞান যথাবিহিত নয়।”
❏ একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ ফরমান, “আমার ক্ষেত্রে আমি স্থিরভাবে বসা অবস্থায় (তথা এলিয়ে পড়া/ হেলান দেয়া অবস্থায়) খাবার গ্রহণ করি না।” [আল-বুখারী]
স্থিরভাবে উপবেশন হচ্ছে খাবার গ্রহণের জন্যে শক্তভাবে বসা বা গা এলানো, যার উদাহরণ পা আড়াআড়ি পেতে বা অন্য কোনো আরামদায়ক পন্থায় রেখে বসা। এভাবে যে ব্যক্তি বসে, সে খাবার চায় এবং প্রচুর পরিমাণেই তা চায়।
❏ মহানবী (ﷺ) খেতে বসলে পায়ের ওপর এমনভাবেই বসতেন যেন ওঠে যেতে তিনি সদাপ্রস্তুত। [মুসলিম]
❏ হুযূর পূর নূর (ﷺ) ইরশাদ ফরমান, “আমি একজন বান্দা। কোনো বান্দা যেমনভাবে খায় এবং যেভাবে বসে, আমিও তেমনিভাবে খাই ও বসি।”
[হযরত ইবনে উমর (رضي الله عنه) হতে দুর্বল সনদে আল-বাযযার বর্ণিত হাদীস]
এই হাদীসের অর্থ স্রেফ কারো শরীর একপাশে এলানো নয়, যেমনটি কিছু মানুষ বলে থাকে। নবী করীম (ﷺ)-এর ঘুমের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য ছিল। তিনি অল্প ঘুমোতেন। সহীহ আহাদীস এর পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে। উপরন্তু,
❏ মহানবী (ﷺ) বলেন, “আমার নয়নযুগল ঘুমোয়, কিন্তু আমার কলব্ (অন্তর) ঘুমোয় না।” [মুসলিম ও আল-বুখারী]
মহানবী (ﷺ) তাঁর শরীর মোবারকের ডানপাশে কাত হয়ে ঘুমোতেন, যাতে কম ঘুমোতে পারেন; কেননা বামপাশে কাত হয়ে ঘুমোনো হৃদযন্ত্র ও শরীরের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্যে সহজতর, যেহেতু এগুলো বামদিকেই অবস্থান করে। তাই বামপাশে কাত হয়ে ঘুমোলে গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন হতে হয়। কিন্তু কেউ ডানদিকে কাত হয়ে ঘুমোলে তার হৃদযন্ত্র ঝুলে থাকে এবং আলোড়িত হয়; ফলে তিনি তাড়াতাড়ি জেগে ওঠেন এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হন না।
________________
কিতাবঃ আশ শিফা [অসম্পূর্ণ]
মূল: ইমাম কাজী আয়াজ (رحمة الله)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
সূত্রঃ 🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন