দশম পর্ব
******
পূর্ব প্রকাশিতের পরর
----------------
উপসংহার:
======
উপরের ছয়টি আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো - শুধু ছেলে বা মেয়েকেই আহলে বাইত বলা হয় না ; বরং স্ত্রীকেও আহলে বাইত বলা হয়। অতএব, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ' আহলে বাইত' বলতে শুধু আলী, ফাতিমা, হাসান, হোসাইনকেই বুঝায় না - বরং বিবিগণকেও বুঝায় - যেমনটি ঘটেছে সূরা আহযাবের ৩২-৩৩ আয়াতের বেলায়। কিন্তু শিয়ারা হুযুরের বিবিগণকে আহলে বাইত স্বীকার করে না। এটা তাদের গোঁড়ামী।
আহলে সুন্নাতের মতে, আহকে বাইত বলতে প্রথমত: বিবিগণকেই বুঝায়। সে সাথে তাঁদের সন্তানগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত হন। তবে জনগণের চর্চার কারণে এবং কতেকটা কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনার কারণে ”আহলে বাইত” বলতে প্রথমেই হযরত আলী, বিবি ফাতিমা ও ইমাম হাসান হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমাদের কথাই মানসপটে ভেসে উঠে। তাই জনগণ ”আহলে বাইত”, বলতে প্রথমে ওনাদেরকে বুঝে। তবে এই কথার অর্থ এ নয় যে, হুযুরের পবিত্র বিবিগণ মোটেই ”আহলে বাইত”নন। এটা শিয়াদের জবরদস্তি এবং অপব্যাখ্যা মাত্র। কুরআন এবং হাদীসের কোথাও এ কথার উল্লেখ্য নেই যে, হুযুরের বিবিগণ ”আহলে বাইতের” অন্তর্ভূক্ত নন।
হাদীসের দ্বারা বিবিগণের আহলে বাইত হওয়ার প্রমাণ:
১। বাংলায় উচ্চারণ: ”মা - আলিমতু আলা আহলী ইল্লা খইরান” (বুখারী শরীফ)
অর্থ: ”নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ”আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানি না।”
ব্যাখ্যা: মুনাফিকরা যখন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এর চরিত্রের উপর অপবাদ রটনা করেছিল, তখন গায়েবী এলেমের অধিকারী নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহী নাযিলের পূর্বেই একদিন এরশাদ করলেন - ”আমি আমার পরিবার (আয়েশা) সম্পর্কে ভালই জানি”- অর্থাৎ ”তাঁর উত্তম চরিত্র সম্পর্কে আমার কোন সন্দেহ নেই”।
বুখারী শরীফের উক্ত বর্ণনার দ্বারা দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে। যথা:
(১) হুযুরের বিবি হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হুযুরের ”আহলে বাইত”। কেননা, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাঁকে আহলী (আমার আহলে বাইত) বলেছেন। হুযুরের বানী অগ্রাহ্য করে শিয়াগণ শুধু ৪ জনকেই আহলে বাইত সাব্যস্ত করেছে। এতে তারা মারাত্মক ভ্রমে পতিত হয়ে গোমরাহ হয়েছে।
(২) মুনাফিক, বেঈমান ও নবী বিদ্বেষী ওহাবী - মৌদুদী সম্প্রদায়ের লোকেরা নবীজীর অদৃশ্য বিষয়ের এলেম (ইলমে গায়েব) সম্পর্কে নিরীহ জনগণের মনে এই সন্দেহ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা অহরহ চালিয়ে যাচ্ছে যে - যদি তিনি ইলমে গায়েব জানতেন - তবে একমাস পর্যন্ত চুপ রইলেন কেন? আল্লাহর পক্ষ হতে অহী নাযিলের পূর্বেই তো তিনি বলে দিতে পারতেন যে - আয়েশার চরিত্রে কোন দোষ নেই। এতেই বুঝা যায় - নবীর ইলমে গায়েব ছিল না (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের এই কু - ধারণাকে বুখারী শরীফের উল্লিখিত বর্ণনাই মিথ্যা প্রমাণিত করছে। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এর পবিত্র চরিত্র সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্দেহাতীতভাবেই পূর্বেই জানতেন। এজন্যই - ”মা - আলিমুত আলা আহলি ইল্লা খইরান”- অর্থাৎ ”সন্দেহাতীতরুপেই আমি আমার পরিবারের উত্তম চরিত্র সম্বন্ধে অবগত রয়েছি” - বলে পূর্বেই ঘোষণা করেছেন। কিন্তু জানা সত্বেও হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মুনাফিকদের জবাব না দিয়ে বরং আল্লাহকে দিয়ে বিষয়টির সমাধান করে তিনি মহা প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এতে পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ চিরতরে দূরীভূত হয়েছে, মুনাফিকরা অপদস্ত হওয়ার সাথে সাথে খোদায়ী শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে এবং হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ”সিদ্দীকা” খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পবিত্র চরিত্রের ঘোষণা আসমানে জমিনে সর্বত্র ঘোষিত হয়েছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ইলমে গায়েব দ্বারা ফয়সালা করলে উক্ত মহত্ব প্রকাশ পেতনা। আর ওহাবী মুনাফিকরা তখন হয়তো আরো একটি অপবাদ রটনা করতো যে - হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্যই আগেভাগে এরূপ করেছেন। তবুও তারা হুযুরের ইলমে গায়েব স্বীকার করতোনা।
বিশেষ অনুরোধ:
সুন্নী উলামাগণ বুখারী শরীফের এই হাদীসখানার ব্যাখ্যা ভালভাবে স্মরণ রাখলে ওহাবীদের মোকাবেলায় ”ইলমে গায়েব”- এর মোনাযারায় অতি সহজেই তাদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবেন - লেখক।
উপসংহার:
======
মোদ্দা কথা হলো: কুরআন সুন্নাহর দলিলাদি দ্বারা একথাই প্রমাণিত হলো যে, আহলে বাইত বলতে শুধু ছেলে - মেয়ে ও নাতী - নাতনীকেই বুঝায় না - বরং স্ত্রী ও ছেলে - মেয়ে সকলকেই বুঝায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ”আহলে বাইত” বলতে হযরত খাদিজা, হযরত আয়েশা সহ সকল বিবিগণ এবং চার পুত্র, চার কন্যা, ইমাম হাসান - হোসাইন ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমাকেও বুঝায়।
এ ছাড়াও ঘোষণার মাধ্যমে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদেরকে ”আহলে বাইত” বলেছেন - তাঁরাও নবী পরিবারের শামিল। এখানে যুক্তি তর্ক অচল। যেমন: শিফা শরীফে আহলে বাইত অধ্যায়ে কাজী আয়ায রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিভিন্ন হাদীস উদ্ধৃত করে প্রমান করেছেন যে -হযরত আব্বাস ও তার সন্তানগণ, হযরত আকীল ও হযরত জাফর শহীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি গণের পরিবারবর্গকেও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ”আহলে বাইত” ঘোষণা করে খোদার কাছে তাঁদের জন্য দোয়া করেছিলেন।
হযরত আব্বাস ও তাঁর সন্তানগণকে একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে এই দোয়া করেছিলেন - ”হে আল্লাহ! আব্বাস আমার চাচা এবং পিতৃতুল্য। এরা আমার ”আহলে বাইত”। আমি আমার চাদর দ্বারা যেভাবে তাঁদেরকে আবৃত করেছি - তুমিও তদ্রুপ আপন রহমত দ্বারা তাঁদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে রাখিও” (বুখারী শরীফ)। আহলে বাইত - এর বৃহৎ পরিসরে যাঁদের নাম প্রথমেই মানসপটে ভেসে উঠে - তাঁরা হলেন - হযরত বিবি ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁদের বংশধরগণ। কেননা তাঁদের বৈশিষ্টই আলাদা। তাই বলে অন্যদেরকে আহলে বাইত বলে অস্বীকার করলে নবীজীকেই অস্বীকার করা হয়। ইহাই আহলে সুন্নাতের ইমামগণের মতামত।
শিয়াগণের বাড়াবাড়ি এবং তাদের অনুসারী ও অনুগামী কিছু সংখ্যক সুন্নী মুসলমানের বিভ্রান্তি থেকে আল্লাহ আমাদের ঈমান হেফাযত করুন এবং হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সকল আহলে বাইত ও বংশধরগণের প্রতি মহব্বত নসীব করুন। খাস করে ”পাক পাঞ্জাতনের” রুহানী ফয়েয ও বরকত নসীব করুন।
উলামাগণ মুফতি আহমদ ইয়ার খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি - এর উক্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি বিশেষভাবে অনুধাবন করবেন বলে আশা রাখি। - লেখক।
উস্তাজুল উলামা আল্লামা আবদুল জলীল রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর 'শিয়া পরিচিতি' থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন