শিয়া পরিচিতি


দশম পর্ব
*****
পূর্ব প্রকাশিতের পর
-----------------
২। বাংলা উচ্চারণ: ইন্নামা  ইউরিদুল্লাহু লি -  ইউযহিবা আনকুমুর           রিজছা         আহলাল          বাইতি         -         ওয়া ইউত্বহহিরাকুম      তাত্বহিরা,     (সূরা     আহযাব      -      ৩৩  আয়াত)।

অর্থ:  ”হে  নবী পরিবারবর্গ! আল্লাহ  তায়ালা ইহাই চান যে, তোমাদের থেকে তিনি  অপবিত্রতাকে  দূরে রাখেন এবং      তোমাদেরকে    অতি    উত্তমরুপে     পাক      পবিত্র করেন”।

শানে       নুযুল:       হযরত      আবদুল্লাহ       ইবনে      আব্বাস  রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং ইকরামা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: সূরা আহযাবের উক্ত আয়াত এবং  পূর্ববর্তী ৩২ নং  আয়াত  দুটি   নবী  করিম  সাল্লাল্লাহু    আলাইহি  ওয়া সাল্লাম এর বিবিগণকে  সম্বোধন করে নাযিল হয়েছে  - (ইবনে   আবি    হাতেম     ও     ইবনে   জরীর)।    'আহলাল বাইতি'বলে   নবীর   বিবিগণকে     সম্বোধন   করা   হলেও সমগ্র       মুমিন       নারীগণকে       লক্ষ্য        করেই       তাদের  হেদায়েতের       উদ্দেশ্যে       আল্লাহ       তায়ালা         এরশাদ করেছেন  - ”(৩২) হে নবী পত্নীগণ, তোমরা অন্যদের মতো  সাধারণ নারী নও। যদি  তোমরা  আল্লাহকে  ভয় করো,    তাহলে    পুরুষদের    সাথে     এমন    কোমল    ও   আকর্ষণীয়  ভঙ্গিতে   কথা বলোনা  - যাতে অন্তরের  দুষ্ট  রোগে  আক্রান্ত  লোকের  মনে  কু  -   বাসনা  জন্ম   নেয়। তোমরা সংগত ও সহজভাবে ভাল কথাবার্তা বলবে ”। '   (৩৩)  (হে    নবী  পত্নীগণ)  তোমরা  নিজেদের  গৃহেই অবস্থান    করবে     এবং    পূর্ববর্তী    জাহেলিয়াত     যুগের   নারীদের     মত     বেপর্দা      হয়ে     নিজেদেরকে      প্রদর্শন করবেনা, নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং  আল্লাহ  ও   রাসুলের  আনুগত্য  করবে।  হে   নবীর পরিবারবর্গ!       আল্লাহ      তো      এটাই     চান      যে,     তিনি তোমাদের     থেকে   অপবিত্রতাকে  দূরে   রাখবেন  এবং তোমাদেরকে পূর্ণরুপে ও উত্তমরুপে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে দেবেন।” (সূরা আহযাব ৩২ ও ৩৩)।

উক্ত   আয়াতদ্বয়ের   ব্যাখ্যা:   নবী   পত্নীগণকে   সম্বোধন  করে  যদিও  আল্লাহ  তায়ালা  উক্ত  দুটি  আয়াত  নাযিল  করেছেন       এবং       'আহলাল        বাইতি'         বলে       নবীর বিবিগণকেই     মূখ্যত:     পাক       পবিত্র      করার      ওয়াদা করেছেন,  কিন্তু   লক্ষ্য  হচ্ছে নারী  জাতী এবং  নবীজীর সমগ্র   পরিবারবর্গ।  সে  জন্যই   নবী    করিম    সাল্লাল্লাহু আলাইহি    ওয়া   সাল্লাম    উক্ত    আয়াত   নাযিল   হওয়ার পরপর  হযরত আলী,  ফাতিমা, ইমাম  হাসান  ও ইমাম হোসাইন     রাদ্বিয়াল্লাহু      আনহুমাগণকে      ডেকে       এনে নিজের গায়ের চাদরখানা দিয়ে তাঁদেরকে বেষ্টন করে  এই    দোয়া    করলেন:    ”হে    আল্লাহ!!    এরাও    আমার  আহলে  বাইত বা আমার  পরিবারবর্গ; হে আল্লাহ! তুমি এদেরকে খুব পবিত্র করো” (ইবনে জরীর)।

সুতরাং  কুরআনের ”আহলাল বাইতি”- এর  মধ্যে এই চারজনকেও      নবী     করিম    সাল্লাল্লাহু    আলাইহি    ওয়া সাল্লাম  শামিল  করে   নিলেন।   ইহাই  আহলে  সুন্নাতের ব্যাখ্যা  ও    আক্বীদা   (কানযুল   ঈমান  -    ইমাম  আহমদ রেজা)। মোদ্দা কথা   - ”আহলে  বাইত”   বলতে যদিও পরিবারের  স্ত্রী,  পুত্র,  কন্যা   -  সকলকেই   বুঝায়,  কিন্তু আয়াতের      ধারাবাহিকতায়      শুধু      নবী      পত্নীগণকেই  ”আহলাল     বাইতি”     বলে     সম্বোধন       করার       করণে উপরোক্ত চারজন  বাদ পড়ার ধারণা  আসার  সম্ভাবনা  থেকে যায়। তাই   নবী করিম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়া সাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে উক্ত ধারণা দূর করে দেন।

এখন   নবী  পরিবারের   সকল  সদস্যই  উক্ত  আয়াতের অন্তর্ভূক্ত   হয়ে   গেলেন।   ইহাই   হক্ক    ফয়সালা।    ইহাই আয়াতের    সঠিক    ব্যাখ্যা।     এই    আয়াতকে     আয়াতে তাত্বহীর  বলা হয় এবং চাদরে  আবৃত   হওয়ার  কারণে উক্ত চার সদস্যকে (ফাতেমা, আলী, হাসান, হোসাইন) আলে আবা,  আলে  কাছা, আলে রেদাও বলা  হয় এবং আল্লাহ       কর্তৃক       পবিত্রতা      ঘোষণার      কারণে      হুযুর সাল্লাল্লাহু      আলাইহি      ওয়া     সাল্লাম       সহ     চারজনের  সকলকে     ”পাক     পাঞ্জাতন”     বলা     হয়।       এটা     শুধু হাদীসের বৈশিষ্টের করণে। কিন্তু আয়াতের  মর্মানুসারে হুযুরের  বিবিগণসহ  সকলেই   আহলে   বাইত  ও    পাক  পবিত্র - এর অন্তর্ভূক্ত। আয়াতের শানে নুযুল বাদ দিয়ে উক্ত   চারজনকেই  শিয়াগণ  শুধু  হাদীস  দ্বারা  ”আহলে  বাইত” বলেছে।  এটা তাদের অপব্যাখ্যা।   তবে  পাক  পাঞ্জাতনের    মর্তবা   অন্যান্য   আহলে    বাইতের    মধ্যে  সবার উর্দ্ধে।

৩।  বাংলা  উচ্চারণ:  ”ফালতাক্বাতাহু  আলু ফিরআউনা  লিয়াকূনা   লাহুম   আদুওয়াও   ওয়া   হাযানান”   (সূরা   -  কাসাস, ৮ আয়াত)।

অর্থ:   ”অত:পর   ফেরাউনের   ঘরের   লোকেরা   (আলে  ফেরাউন)     হযরত     ম্যছা    আলাহিস    সালামকে    তুলে নিলো। মুছা এদের শত্রু ও অশান্তির কারণ হবেন।”

ব্যাখ্যা:  ”ফেরাউনের  স্ত্রী   আছিয়া     নদী  থেকে   হযরত মুছা আলাইহিস  সালাম   কে তুলে নিয়েছিলেন। হযরত মুছা আলাইহিস সালাম পরবর্তীতে ফেরাউনের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন  এবং  ফেরাউনের ধবংসের  কারণ   হয়ে উঠেছিলেন। উক্ত আয়াতে বিবি আছিয়াকে ”আলে ফেরাউন”   বলা   হয়েছে।   আল  ও  আহল  শব্দদ্বয়  স্ত্রীর ক্ষেত্রেও     ব্যবহৃত     হয়।     ”সুতরাং     আমাদের     নবীর  বিবিগণও আলে রাসুলের অন্তর্ভূক্ত”।

৪।  বাংলা   উচ্চারণ:  ”ফা - ক্বালা   লি -   আহলিহিমকুছু ইন্নি আ- নাছতু নারান” (সূরা ত্বহা, আয়াত - ১০)।

অর্থ: ”হযরত মুছা  আলাইহিস সালাম  ’স্বীয় আহলকে’ বললেন  - তোমরা  অপেক্ষা    করো,  আমি আগুন নিয়ে  আসি”।
ব্যাখ্যা:  এই   আয়াতে  হযরত  মুছা   আলাইহিস  সালাম আপন   স্ত্রী   সফুরাকে    ঐ   কথাটি  বলেছিলেন।   আল্লাহ পাক বিবি সফুরাকে  হযরত  মুছা আলাইহিস সালামের ”আহল”    বলেছেন।   বুঝা  গেল   -   স্ত্রী  স্বামীর   আহলে বাইত।

৫। বাংলা উচ্চারণ: ”ফা - নাজজাইনাহু ওয়া   আহলাহু মিনাল কারবিল আযীম” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত - ৭৬)।

অর্থ:      ”অত:পর    আমি     উনাকে     (নূহ)     এবং     উনার পরিবার    পরিজনকে    (আহলকে)    বড়    বিপদ     থেকে  নাজাত দিয়েছি।”
ব্যাখ্যা:     এ     আয়াতে      আল্লাহ     তায়ালা      হযরত     নূহ আলাইহিছ      ছালামের   মুমিন     স্ত্রী    ও   মুমিন   সন্তানকে যৌথভাবে তার ”আহল” বলে  উল্লেখ করেছেন।   বুঝা গেল   -   স্ত্রী      ও     সন্তান   -     সবাই   নূহ   নবীর   ”আহলে বাইতের” অন্তর্ভূক্ত।

৬।      বাংলা       উচ্চারণ:       ”ক্বালাত      ইয়া       ওয়াইলাতা আআলিদু ওয়া আনা আজুযুন ওয়া হাযা বা'লী শাইখা। ইন্না হাযা লাশাইউন আজীব। ক্বালু আতা'জাবীনা   মিন  আমরিল্লাহি   - রহমাতুলাহি ওয়া বারাকাতুহু আলাইকুম আহলাল বাইতি; ইন্নাহু হামীদুম মাজীদ!”।  (সূরা  হুদ, আয়াত - ৭২)।

অর্থ:   ”(হযরত  সারা)   বললেন  -   কি   আশ্চর্য!    আমার সন্তান হবে?  অথচ আমি  বৃদ্ধা  হয়ে গেছি   এবং  আমার স্বামীও বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। নিশ্চয়ই এটা অদ্ভুত ব্যাপার। ফিরিস্তাগণ  বললেন  -  আল্লাহর  কাজে  কি  আশ্চর্যবোধ  করছেন?   হে    ইব্রাহীমের  ঘরের   বাসিন্দাগণ  (আহলে বাইত)  আল্লাহর     রহমত  ও    বরকত  সমূহ  তোমাদের উপর      রয়েছে।    অবশ্যই    তিনি     যাবতীয়    সৌন্দর্যের অধিকারী ও মর্যাদার অধিকারী”।

ব্যাখ্যা:   হযরত   ইব্রাহীম   আলাইহিস   সালাম   ও   বিবি  সারা   বৃদ্ধ  বয়সে  পৌঁছে   ফেরেস্তাদের  মাধ্যমে   হযরত ইসহাক  আলাইহিস  সালাম    এর   জন্মের   শুভ   সংবাদ লাভ   করেন।  উক্ত  ফিরিস্তারা  হযরত  লুত   আলাইহিস  সালাম এর এলাকা ধবংস    করার   জন্য যাওয়ার  পথে হযরত   ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম  কে এ  শুভ সংবাদ দেন।      তাঁর      পাশেই     স্ত্রী      সারা     দাঁড়ানো      ছিলেন। ফিরিস্তাদের   কথা   শুনে   তিনি  আশ্চর্য   হয়ে  উক্ত  উক্তি  করেছিলেন।   ফিরিস্তারা   জবাবে    বিবি   সারাকে    লক্ষ্য করেই      ”আহলাল       বাইতি”       বা       হযরত      ইব্রাহীম  আলাইহিস সালাম এর পরিবার বলেছিলেন। বুঝা গেল - বিবিও স্বামীর ”আহলে বাইতের”অন্তর্ভূক্ত।


উস্তাজুল উলামা আল্লামা আবদুল জলীল রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর 'শিয়া পরিচিতি' থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।


(চলবে)

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন