প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াতের বিবরণ ২
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
---------------------
তাবুকের যুদ্ধে কোন কোন মুনাফিক মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে অংশ গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। তাদের এ ছল-ছাতুরী রাসূল (ﷺ)-এর কাছে ধরা পড়েনি। তাই রাসূল (ﷺ) তাদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করার অনুমতি দিয়ে দেন। তাই এ আয়াতে কেন তিনি অনুমতি দিলেন সে কারণে তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করা হয়েছে। যদি রাসূল (ﷺ) ইলম গায়বের অধিকারী হতেন, তা’হলে আসল ব্যাপারটি তাঁর নিকট প্রকাশ হয়ে পড়তো।
উত্তরঃ এ আয়াতে হুযুর আলাাইহিস সালামকে না কোন ভর্ৎসনা করা হয়েছে, না তিনি তাদের চালবাজী সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন। বরং রাসূল (ﷺ) তাদের অবস্থা জেনেও তাদের গোমর ফাঁস না করেই অনুমতি প্রদান করেছিলেন। তাই আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, হে অপরাধীদের গোপনীয়তা রক্ষাকারী। আপনি তাদেরকে কেন অপদস্থ করলেন না? ভর্ৎসনা করা হয় ভুলত্রুটির জন্য। এখানে কোন ধরনের ত্রুটি হলো? عَفَا اللهُ (আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন) হচ্ছে আশীর্বাদসূচক বাক্য; ভর্ৎসনার জন্য এ বাক্যটি প্রয়োগ করা হয়নি।
(১৩)وَيَسْئَلُوْنَكَ عَنِ السَّاعَةِ اَيَّانَ مُرْسَهَا . فِيْمَ اَنْتَ مِنْ ذِكْرَهَا
-‘‘আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে এরা জিজ্ঞাসা করছে যে, উহা কোন সময়ের অপেক্ষায় আছে? এ তথ্যের সাথে আপনার কীই বা সম্পর্ক আছে?
{সূরাঃ নাযিআত, আয়াতঃ ৪২-৪৩, পারাঃ ৩০}
এ আয়াতকে বিরুদ্ধমতাবলম্বীগণ তাদের দাবীর সমর্থনে প্রমাণস্বরূপ উত্তাপন করে বলেন যে, কিয়ামত কখন হবে, এ সম্বন্ধে রাসূল (ﷺ)-এর জ্ঞান ছিল না। তাই তিনি সম্পূর্ণরূপে ‘ইলমে গায়ব’ এর অধিকারী হননি। বস্তুতঃ সঠিক কথা হলো যে আল্লাহ তা’আলা রাসূল (ﷺ)কে এ জ্ঞানও দান করেছেন। তাফসীরকারকগণ এ আয়াতের কয়েকটি প্রায়োগিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। এক, এ আয়াতটি কিয়ামতের জ্ঞান দান করার পূর্বেই নাযিল করা হয়েছিল। দুই, এ উক্তি দ্বারা প্রশ্নকারীদের উত্তর দেয়া থেকে তাঁকে বিরত রাখাই উদ্দেশ্য, রাসূল (ﷺ) জ্ঞানের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন নয়। তৃতীয়তঃ এ আয়াতে বলা হয়েছে اَنْتَ مِنْ ذِكْرَهَا অর্থাৎ আপনি নিজেই তো কিয়ামতের লক্ষণসমূহের অন্যতম। আপনাকে দেখেই তাদের জেনে নেওয়া উচিত যে কিয়ামত নিকটবর্তী। চতুর্থতঃ এখানে বলা হয়েছে, তাঁকে সে সব তথ্য পৃথিবীতে প্রকাশ করার জন্য পাঠানো হয়নি।
❏ ‘তাফসীরে সাবী’তে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ
وَهَذَا قَبْلَ اِعْلاَمِهِ بِوَقْتِهَا فَلاَيُنَافِى اَنَّهُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ لَمْ يَخْرُجْ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى اَعْلَمَهُ اللهُ بِجَمِيْعِ مُغَيِّبَاتِ الدُّنْيَا وَالْاَخِرَةِ
অর্থাৎ- এ আয়াতটি রাসূল (ﷺ)কে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে অবহিত করার পূর্বেই নাযিলকৃত।
{ইমাম সাভীঃ তাফষীরে সাভীঃ ৬/২৩১-২৩২ পৃ.}
সুতরাং, এ বক্তব্যটি সে উক্তির বিপরীত নয়, যেখানে বলা হয়েছে ‘পৃথিবী থেকে রাসূল (ﷺ) বিদায় গ্রহণ করেন নি, ততক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত জ্ঞান দান করেছেন।
❏ তাফসীরে ‘রূহুল বয়ানে’ আছেঃ
قَدْذَهَبَ بَعْضُ الْمَشَائِخِ اِلَى اَنَّ النَّبِىَّ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ يَعْرِفُ وَقْتَ السَّاعَةِ بِاِعْلاَمِ اللهِ وَهُوَ لاَيُنَافِى الْحَصْرَ فِى الْاَيَةِ
অর্থাৎ- কোন কোন মাশায়িখ এ মত পোষণ করেন যে, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক উক্ত সময় সম্পর্কে তাকে অবহিত করার ফলশ্রুতিতে তিনি (ﷺ) কিয়ামতের সময় সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন এবং এ উক্তিটি এ আয়াতের অন্তর্নিহিত ‘সীমাবদ্ধতার সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ নয়।
{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ২০/৩৮৭ পৃ.}
অর্থাৎ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের সময় সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহর জন্য খাস। মাশায়িখের উপরোক্ত উক্তিটি কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা জ্ঞাপক এ আয়াতটির বিপরীত নয়।)
❏ তাফসীরে ‘রূহুল বয়ানে’ ৯ম পারার
يَسْئَلُوْنَكَ كُاَنَّك حَفِىُّ عَنْهَا আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতেও এ ভাষ্যই উল্লেখিত আছে।
{সূরাঃ আ’রাফ, আয়াতঃ ১৮৭, পারাঃ ৯}
{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৩/৩৭১-৩৭২}
পরিপ্রেক্ষিতেও এ ভাষ্যই উল্লেখিতর আছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পৃথিবীর পূর্ণ বয়স সত্তর হাজার বছর এবং এ তথ্যটি বিশুদ্ধ রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত। তাই বোঝা গেল যে, রাসূল (ﷺ)-এর কিয়ামতের জ্ঞান ছিল।
❏ তাফসীরে ‘খাযেনে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ
وَقِيْلَ مَعْنَاهُ فِيْمَا اِنْكَارٌُ لِسَوَالِهِمْ اَىْ فِيْمَا هَذَا السَّوَالُ ثُمَّ قَالَ اَنْتَ يَامُحُمَّدُ مِنْ ذِكْرَاهَا اَىْ مِنْ عَلاَمَا تِهَا لِاَنَّكَ اَخِرُ الرُّسُلِ فَكَفَا هُمْ ذَلِكَ دَلِيْلاً عَلَى دُنٌُوِهَا
অর্থাৎ- কারো কারো মতে فِيْمَا শব্দ দ্বারা কাফিরদের অবাঞ্ছিত প্রশ্নের অযৌক্তিকতার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের এ আবার কোন ধরনের প্রশ্ন। অতঃপর বলেছেন- হে মুহাম্মদ (ﷺ)! আপনি নিজেই কিয়ামতের নির্দেশনাবলীর অন্যতম। কেননা আপনি হলেন সর্বশেষ নবী। সুতরাং, কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ হিসাবে তাদের জন্য এতটুকুইতো যথেষ্ট।
{ইমাম খাযেনঃ তাফসীরে খাযেনঃ ২/২৭৯ পৃ.}
❏ ‘তাফসীরে মাদারিকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছেঃ
اَوْكَانَ رَسُوْلُ اللهِ عَلَيْهِ السَّلاَمُ لَمْ يَزَلْ يَذْكُرُ السَّاعَةَ وَيَسْأَلُ عَنْهَا حَتَّى نَزَلَتْ فَهُوَ تَعَجُّبٌُ مِنْ كَثَرَةِ ذِكْرِهَا
অর্থাৎ- অথবা রাসূল (ﷺ) কিয়ামত সম্পর্কিত ব্যাপারে অনেক কিছু বর্ণনা করতেন এবং এ পসঙ্গে তাকে বিবিধ প্রশ্ন করা হতো। শেষ পর্যন্ত এ আয়াতটি অবতীর্ণ করা হয়।
{ইমাম নাসাফীঃ তাফসীরে মাদারিকঃ ১/৪৫৪ পৃ.}
সুতরাং, এ আয়াতে কিয়ামত সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) এত অতিরিক্ত বর্ণনার জন্য বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। এ আয়াতের মর্মার্থ হলো আপনি (ﷺ) কিয়ামতের আর কত বর্ণনা দিবেন।
❏ উক্ত তাফসীরে মাদারিকে এ আয়াত প্রসঙ্গে আরও উল্লেখিত আছেঃ
اَوْفِيْمَا اِنْكَارٌُ لِسَوَالِهِمْ عَنْهَا اَىْ فِيْمَا هَذَا لسُّوَالُ ثُمَّ قَالَ اَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا وَاَنْتَ اَخِرُ الْاَنْبِيَاءِ عَلاَمَةٌُ مِنْ عَلاَماَتهِاَ فَلاَ مَعْنَى لِسَوَالِهِمْ عَنْهَا
অর্থাৎ- অথবা, فِيْمَا শব্দ দ্বারা কাফিরদের অবান্তর প্রশ্নের অসারতার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ প্রশ্নটিইবা কোন্ ধরনের। অতঃপর বলেছেন ‘আপনি এ কিয়ামতের চিহ্ন সমূহের একটি। সুতরাং, এমতাবস্থায় তাদের কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করার কীই বা অর্থ হতে পারে।
{ইমাম নাসাফীঃ তাফসীরে মাদারিকঃ ১/৪৫৪ পৃ.}
এ আয়াতের মর্মার্থ হলো- কিয়ামত সম্পর্কে তাদের প্রশ্ন করাটা অহেতুক, আপনি নিজেই কিয়ামতের আলামত স্বরূপ। তবুও তারা কেন এ প্রশ্ন করে?
❏ ‘তাফসীরে মাদারিকে’ সে একই আয়াত প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছেঃ
قِيْلَ فِيْمَا اَنْتَ مِنْ ذِكْرَهَا مُتَّصِلٌُ بِالسَّوَالِ اَىْ يَسْئَلُوْ نَكَ عَنِ السَّاعَةِ اَيَّانَ مُرْسهْاَ وَيَقُوْلُوْنَ اَيْنَ اُنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا ثُمَّ اسْتَانَفَ فَقَالَ اِلَى رَبِّكَ
অর্থাৎ- এবং বলা হয়েছে যে, فِيْماَ فِيْمَا اَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا. এ অংশটুকুর সম্পর্ক হচ্ছে আয়াতে উক্ত প্রশ্নের সাথে। কাফিরগণ আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, কিয়ামত কখন হবে? এবং তারা এও বলে যে আপনি এ জ্ঞান কোত্থেকে পেলেন? এরপর আল্লাহ তা’আলা নিজের কথা পুনরারম্ভ করে বলেন اِلَى رَبِّكَ (এ জ্ঞান তার উৎস আল্লাহর দিকেই প্রত্যাগমন করে।
{ইমাম নাসাফীঃ তাফসীরে মাদারিকঃ ১/৪৫৪ পৃ.}
এখন এ আয়াতের মর্মার্থ হলো কাফিরগণ জিজ্ঞাসা করছিলো এ জ্ঞান কোত্থেকে লাভ করলেন? তখন আল্লাহ তা’আরা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর তরফ থেকে। সুতরাং, আয়াতটি রাসূল (ﷺ) কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানেরই প্রমাণবহ।
❏ উপরোক্ত তাফসীর উক্ত আয়াত এর তাফসীরে আরও লিপিবদ্ধ আছেঃ
اِنَّمَاانْتَ مُنَذِرُمَنْ يَّخْشَهَا اَىْ لَمْ تُبْعَثْ ِلُتَعِّلَمُهْم بِوَقْتِ السَّاعَةِ اِنَّمَااَنْتَ الخ
অর্থাৎ- অর্থাৎ আপনাকে এ জন্য পাঠানো হয়নি যে, তাদেরকে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে অবহিত করবেন।
{ইমাম নাসাফীঃ তাফসীরে মাদারিকঃ ১/৪৫৪ পৃ.}
এখন আলোচ্য আয়াতের আসল মতলব হলো কাফিরগণ যে বলে “যদি আপনি কিয়ামতের খবর দিতে পারেন তাহলে আপনি নবী, অন্যথায় নবী নন। এটা নিছক বাজে প্রলাপ বৈ আর কিছু নয়। কেননা, কিয়ামতের খবর দেয়াটা নবুওয়াতের অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য সমূহের অন্তভুর্ক্ত নয়। নবীর জন্য যা জরুরী, তা হচ্ছে ধর্মের নির্দেশাবলীর প্রচার করা।
❏ মাদারিজুন নাবুওয়াতের দ্বিতীয় খন্ডে ৪০ পৃষ্ঠায়
ايذا راسانى كفار فقراء صحاب শীর্ষক পরিচ্ছেদে উল্লেখিত আছেঃ
وبعضے علماء علم ساعت نيز مثل ايں معنى گفته ان
অর্থাৎ কোন কোন আলেম রূহ সম্পর্কিত জ্ঞানের মত কিয়ামত সম্পর্কেও রাসূল (ﷺ)-এর জ্ঞান আছে বলে স্বীকার করেন।
(১৪)يَسْئَلُوْنَكَ كَاَنَّكَ خَفِىٌُّ عَنْهَا قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَاللهِ
অর্থাৎ- তারা আপনাকে এমনভাবে জিজ্ঞাসা করে যে কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞান যেন আপনার নিজস্ব গবেষণালব্দ। আপনি তাদের বলে দিন যে, এ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।
{সূরাঃ আ’রাফ, আয়াতঃ ১৮৭, পারাঃ ৯}
বিরুদ্ধ মতাবলম্বীগণ এ আয়াতটি উপস্থাপন করে বলেন যে, কিয়ামত সম্বন্ধে রাসূল (ﷺ)-এর কোন জ্ঞান নেই। এর দুটি উত্তর রয়েছে। এক, এ আয়াতের মধ্যে কোথায় আছে যে হুযুর আলাাইহিস সালামকে কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহ দান করেন নি? এখানে তো শুধূ এতটুকুই বলা হয়েছে যে এ জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহই। এ জ্ঞান দান করা সম্পর্কে কোন অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়নি এখানে। দুই, এ আয়াতটি কিয়ামতের জ্ঞান দান করার আগেই নাযিলকৃত।
❏ তাফসীরে সাবীতে এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখিত আছেঃ
وَالَّذِىْ يَجِبُ الْاِيْمَانُ بِهِ اَنَّ النَّبِىَّ عَلَيْهِ السَّلاَمُ لَمْ يَنْتَقِلْ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى اَعْلَمَُ ُاللهُ بِجَمِيْعِ الْمُغَيِّبَاتِ الَّتِىْ تَحْصُلُ فِى الدُّنْيَا وَالْاَخِرَةِ فَهُوَ
يَعْلَمُ هَا كَمَاهِىَ عَيْنَ يَقِيْنٍ لِّمَا وَرَدَ رُفِعَتْ لَى الدُّنْيَا فَاَنَا اَنْظُرُ فِيْهَا كَماَ اَنْظُرُ اِلَى كَفِّىْ هَذِهِ وَوَرَدَ اَنَّاهُ اُطُّلِعَ عَلَى الْجَنَّةِ وَمَا فِيْهَا وَالنَّارِ وَمَافِيْهَا وَغَيْرِ ذَلِكَ مِمَّا تَوَاتَرَتِ الْاَخْبَارُ وَلَكِن اُمِرَ بِكِتْمَانِ بَعْضِهَا
অর্থাৎ- এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি বিশ্বাস করা একান্ত দরকার, সেটা নবী আলাইহিস সালাম পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন নি, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআরা রাসূল (ﷺ) সে সমস্ত অদৃশ্য ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে অবহিত করেছেন, যা দুনিয়া ও আখিরাতে সংঘটিত হবে। তাঁর জ্ঞান একজন প্রত্যক্ষদর্শীয় জ্ঞাত তথ্যের মত। কেননা, হাদীছে বর্ণিত আছে- ‘আমার সামনে দুনিয়াকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমি নিজের হস্তস্থিত বস্তু দেখার মত সবকিছুর প্রতি দৃষ্টিপাত করছিলাম। আরও বর্ণিত আছে যে, তাঁকে বেহেশ্ত ও সেখানকার যাতীয় নিয়মত, দেযাখ ও সেখানকার যাবতীয় শাস্তি ও যন্ত্রণা সম্পর্কে সম্যকরূপে অবহিত করা হয়েছে। তবে এ সম্পর্কিত কিছু কিছু তথ্য তাঁকে গোপন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
{ইমাম সাভীঃ তাফসীরে সাভীঃ ২/৭৩৩ পৃ.}
তাফসীরে খাযেনে এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এ আয়াতটির আসল ইবারত হচ্ছে يَسْئَلُوْنَكَ عَنْهَا كَاَنَّكَ حَفِىٌُّ অর্থাৎ ওই সকল লোক আপনাকে এমনভাবে জিজ্ঞাসা করছে যেন আপনি তাদের প্রতি বড় মেহেরবান। আপনি তাদেরকে এ সম্পর্কে অবহিত করবেন। অথচ এটা খোদার ভেদসমূহের অন্যতম যা অপরের কাছে গোপন রাখা একান্ত দরকার। এতে বোঝা গেল যে রাসূল (ﷺ)-এর কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞান আছে কিন্তু তা প্রকাশ করার অনুমতি নেই।
(১৫)يَسْئَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ قُلْ اِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللهِ
-‘‘লোকেরা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। আপনি বলুন যে এ সম্পর্কে আল্লাহই জ্ঞাত।’’
{সূরাঃ আহযাব, আয়াতঃ ৬৩, পারাঃ ২২}
❏ তাফসীরে সাবীতে এ আয়াতের তাৎপর্য বিশেষণে লিখা হয়েছেঃ
اِنَّمَا هُوَوَقْتُ السُّوَالِ وَاِلاَّفَلَمْ يَخْرُجْ نَبِيُّنَا عَلَيْهِ السَّلاَمُ حَتَّى اَطْلَعَهُ اللهُ عَلَى جَمِيْعِ الْمَغْيِّبَاتِ وَمِنْ جُمْلَتِهَا السَّاعَةُ
-‘‘কিয়ামত সম্পর্কে কেউ সম্যকরূপে অবগত নয় কথাটি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করার সময় প্রযোজ্য ছিল। কেননা নবী আলাইহিস সালাম দুনিয়া থেকে তশরীফ নিয়ে যান নি, যে পর্যন্ত না রাসূল (ﷺ)-কে আল্লাহ তা’আলা যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবহিত করেছেন, যার মধ্যে কিয়ামতও অন্তভুর্ক্ত।’’
{ইমাম সাভীঃ তাফসীরে সাভীঃ ৪/২৮৯ পৃ.}
❏ এ আয়াত প্রসঙ্গে তাফসীরে রূহুল বয়ানে’ আছেঃ
وَلَيْسَ مِنْ شَرْطِ النَّبِىِّ اِنْ يَّعْلَمَ الْغَيْبَ بِغَيْرِ تَعْلِيِمٍ مِّنَ اللهِ تَعَالى
অর্থাৎ- নবী হওয়ার শর্তাবলীর মধ্যে এরূপ কোন শর্ত নেই যে, আল্লাহ কর্তৃক জ্ঞাত করা ছাড়া অদৃশ্য বিষয়াদি জানতে হবে।
{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৭/২৮৮ পৃ.}
আয়াতে কাউকে কিয়ামতের জ্ঞান দান করা সম্বন্ধে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়নি। সুতরাং, রাসূল (ﷺ) এ সম্পর্কে অনবহিত একথাটি আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণ গ্রহণই ভুল।
❏ তাফসীরে সা’বীতে اِلَيْهِ يُرَدُّ عِلْمُ السَّاعَةِ আয়াতটির ব্যাখ্যায় উল্লেখিত আছেঃ
اَلْمَعْنِىْ لاَيُفِيْدُ عِلْمُهُ غَيْرُهُ تَعَالَى فَلاَيُنَافِىْ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ عَلَيْهِ السَّلاَمُ لَمْ يَخْرُجْ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى اُطَّلِعَ عَلَى مَاكَانَ وَمَايَكُوْنُ وَمَا هُوَ كَائِنُ وَمِنْ جَمْلَتِهِ عِلْمُ السَّاعَةِ
অর্থাৎ- এর অর্থ হলো- কিয়ামতের জ্ঞান খোদা ছাড়া কেউ দিতে পারে না। সুতরাং, আয়াতটি ঐ বর্ণনার পরিপন্থী নয়, যেখানে বলা হয়েছে নবী আলাইহিস সালাম দুনিয়া থেকে তশরীফ নিয়ে যান নি, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তা’আলা রাসূল (ﷺ)-কে পূর্বাপর যাবতীয় ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। কিয়ামতের জ্ঞানও এগুলোর অন্তভুর্ক্ত।
{ইমাম সাভীঃ তাফসীরে সাভীঃ ৫/৫২ পৃ.}
বিরুদ্ধমতাবলম্বীগণ কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের অস্বীকৃতির সমর্থনে মিশকাত শরীফের শুরুতে সন্নিবেশিত এ রেওয়াতটি পেশ করেন;
❏ হযরত জিব্রাইল (عليه السلام) একদা রাসূল (ﷺ)-এর কাছে আরয করেছিলেন,
اَخْبِرْنِىْ عَنِ السَّاعَةِ
(আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে খবর দিন।)
❏তখন হুযুুর আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-
مَاالْمَسْئُوْلُ عَنْهَا بِاَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ
অর্থাৎ- এ প্রসঙ্গে আমি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশী কিছু জানি না।
এ থেকে বোঝা গেল যে রাসূল (ﷺ) কিয়ামতের জ্ঞান নেই। কিন্তু এ দলীলটাও দ্বিবিধ কারণে একেবারে ভিত্তিহীন। এর একটি কারণ হলো এতে রাসূল (ﷺ) স্বীয় জ্ঞানের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন নি। কেবল অপেক্ষাকৃত বেশী জ্ঞানের অস্বীকৃতির প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তা নাহলে তিনি বলতেন لاَاَعْلَمُ (আমি জানি না)
এরূপ না বলে এত লম্বা চওড়া কথাই বা কেন বললেন? এর মূল বক্তব্য এও হতে পারে যে, হে জিব্রাইল, এ প্রসঙ্গে আমার ও আপনার জ্ঞান একই ধরনের। অর্থাৎ এ প্রসঙ্গে আমি যেরূপ অবগত আপনিও সেরূপ অবগত আছেন। কিন্তু এ জনসমক্ষে রহস্যের উদঘাটন সমীচীন নয়।
দ্বিতীয় কারণ, হলো উত্তর শুনে জিব্রাইল (عليه السلام) আরয করেছিলেন,
فَاَخْبِرْ عَنْ اَمَارَاتِهَا
(তা’হলে কিয়ামতের লক্ষণ সমূহ বলে দিন)।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) কয়েকটি লক্ষণ বর্ণনা করলেন। যেমন সন্তান-সন্ততির অবাধ্য হওয়া, নীচু জাতের লোকদের পার্থিব সম্মানের অধিকারী হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। যার কিয়ামত সম্পর্কে কোন ধারণাই না থাকে তাঁর নিকট লক্ষণ জিজ্ঞাসা করার কীই বা তাৎপর্য হতে পারে। কোন কিছুর লক্ষণ বা খোঁজ জানতে হলে সে সম্পর্কে জ্ঞাত লোককেই তো জিজ্ঞাসা করা হয়।
উল্লেখ্য যে, রাসূল (ﷺ) কিয়ামতের দিন সম্পর্কে বলে দিয়েছেন।
❏ মিশকাত শরীফের জুমা অধ্যায়ে উল্লেখিত আছেঃ
لاَتَقُوْمُ السَّاعَةُ اِلاَّفِىْ يَوْمِ الْجُمْعَةِ
(জুমার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে)
{আবু দাউদঃ আস-সুনানঃ ১/২৭৪ হাদিস নং- ১০৪৬}
❏আঁক্বা হযরত (ﷺ) নিজ হাতের শাহাদত ও মধ্যমা আঙ্গুলীদ্বয় একত্রিত করে বলেছিলেন,
بُعِثْتَ اَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَا تَيْنِ
আমার এ ধরায় আগমন ও কিয়ামত এ দু’আঙ্গুলীর মত ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
{ক. বুখারীঃ আস-সহীহঃ কিতাবুর-রিককঃ ৫/২৩৮৫ হাদিসঃ ৬১৩৮-৬১৩৯
খ. খতিব তিবরিযীঃ মেশকাতঃ বাবুল খুতবাতুল ইয়াওমাল জুমাঃ প্রথম পরিচ্ছেদঃ ১/১২৩ পৃ.}
অর্থাৎ আমার যুগের পরেই কিয়ামত অনুষ্ঠিতব্য।
(মিশকাত শরীফঃ খুতবায়ে ইয়াওমে জুমা শীর্ষক অধ্যায়)
রাসূল (ﷺ) কিয়ামতের সব লক্ষণই এমনভাবে নির্দেশ করেছেন যে একটি কথাও বাদ দেন নি। আজ আমি হলফ করে বলতে পারি যে কিয়ামত এক্ষুণি সংঘটিত হতে পারে না। কেননা এখনও দাজ্জাল আসেনি হযরত মসীহ (عليه السلام) ও মাহদী (عليه السلام) এর আবির্ভাব হয়নি। এবং সূর্যও পশ্চিম দিকে উদিত হয়নি। এসব লক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সুনিশ্চিত ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে পরিস্ফুট করে দিয়েছেন। এর পরও কিয়ামতের জ্ঞান না থাকার কি অর্থ হতে পার? শুধু এতটুকু বলা যায় যে সনের কথা উল্লেখ করেন নি। অর্থাৎ অমুক সনে কিয়ামত সংঘটিত হবে একথা বলেন নি। স্মর্তব্য যে রাসূল (ﷺ) এর যুগে সন প্রচলিত হয়নি। হিজরী সন হযরত উমর ফারুকের (رضي الله عنه) শাসনামলে প্রবর্তিত হয়। হিজরতের ঘটনা ঘটে রবিউল আউয়াল মাসে কিন্তু হিজরী সনের সূচনা হয় মহররম মাস থেকে। সে যুগে প্রচলিত নিয়ম ছিল যে কোন বৎসর বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলেই তার স্মৃতিবাহী রূপে উক্ত ঘটনার সঙ্গে সনকে সম্পৃক্ত করে দেয়া হতো। যেমন, হাতীর বছর, বিজয়ের বছর, হুদাইবিয়ার বছর ইত্যাদি।
এমতাবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট হিজরী সনের উল্লেখ আদ্যে সম্ভবপর ছিল কি? তাই ঐ দিনের যাতীয় লক্ষণ বলে দিয়েছেন। যে পবিত্র সত্ত্বা বিস্তারিতভাবে এতগুলো লক্ষণের বর্ণনা দিতে পারেন, তিনি কিভাবে সে বিষয়ে অজ্ঞ হতে পারেন? অধিকন্তু আমি ইলমে গায়বের সমর্থনে পূর্বে একটি হাদীছ পেশ করেছি, যেখানে উক্ত হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) কিয়ামত অবধি যাবতীয় ঘটনা প্রবাহের বর্ণনা দিয়েছিলেন। এরপরেও কিয়ামত সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার কথা চিন্তা করার অবকাশ থাকতে পারে কি? দুনিয়ার সমাপ্তি ঘটার সাথে সাথেই তো কিয়ামত। আর রাসূল (ﷺ)-এর আরও জানা আছে যে যাবতীয় ঘটনাবলীর মধ্যে কোনটার পর কোনটা ঘটবে। যে সর্বশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন উহাই দুনিয়ার সমাপ্তি ও কিয়ামতের সূচনার সুস্পষ্ট দিক দর্শনরূপে প্রতিভাত হবে। দুটো পরস্পর মিলিত বস্তুর বা বিষয়ের একটির সমাপ্তির জ্ঞান অপরটির সূচনার জ্ঞান অবশ্যম্ভাবীরূপে জন্ম দেয়। এ ব্যাপারে খুব মনোযোগ সহকারে চিন্তা ভাবনা দরকার। একথাটি প্রণিধানযোগ্য অতিশয় তাৎপর্যমন্ডিত ও অনবদ্য, যা আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও মুরশিদ,হযরত সদরুল আফাজেল মাওলানা সৈয়দ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী সাহেব (رحمة الله) তার এক ভাষণে বলেছিলেন।
(১৬)إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
-‘‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন তিনি জানেন মায়ের পেটে যা’ কিছু আছে, কেউ একথা জানে না যে কাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না যে কোন জায়গায় সে প্রাণ ত্যাগ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয় জ্ঞানী ও অবহিতকারী।’’
{সূরাঃ লোকমান, আয়াতঃ ৩৪, পারাঃ ২১}
এ আয়াতকে সামনে রেখে ভিন্নমতাবলম্বীগণ বলেন যে উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নেই, এটি আল্লাহর গুণ। যে অপর কাউকে এগুলোর অধিকারী সাব্যস্ত করবে, সে মুশরিক বলে গণ হবে। কিয়ামত কখন হবে, বৃষ্টি কখন হবে, গর্ভবতী মহিলার গর্ভে ছেলে কি মেয়ে, আগামীকাল কি হবে এবং কে কোথায় মারা যাবে- এ পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞানকে পঞ্চ বিষয়ের জ্ঞান (عُلُوْمِ خَمْسَه) নামে অভিহিত করা হয়।
❏ এ আয়াতের সমর্থনে তারা মিশকাত শরীফের শুরুতে উল্লেখিত রেওয়াতেটিও উপস্তাপন করেন, যেখানে বলা হয়েছে জিব্রাইল (عليه السلام) রাসূল (ﷺ)কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনিই ইরশাদ করেছিলেনঃ
فِىْ خَمْسِ لاَ يَعْلَمُ هُنَّ اِلاَّ اللهُ ثُمَّ قَرَءَ اِنَّ اللهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ
-‘‘ওই পাঁচটি বিষয় সম্বন্ধে একমাত্র আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কেউ জানে না। এরপর রাসূল (ﷺ) উক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।’’
আমি এ পঞ্চ জ্ঞান সম্পর্কে একান্ত ন্যায়ানুগ বিচার বিশেষণ করার প্রয়াস পাচ্ছি এবং সুধি পাঠকবৃন্দের ন্যায় সঙ্গত বাচ-বিচার ও মহান আল্লাহর নিকট এ আলোচনাটুকু গৃহীত হওয়ার আশা রাখি। আমি প্রথমে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সুপ্রসিদ্ধ তাফসীরকারকদের উক্তি, এরপর উক্ত হাদীছ প্রসঙ্গে সর্বজনমান্য মুহাদ্দিছগণের মন্তব্য ও সর্বশেষে আমার নিজের যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য পেশ করছি।
❏ তাফসীরাতে আহমদীয়ায় উক্ত আয়াতের ব্যা্যখায় উলিখিত আছেঃ
وَلَكَ اَنْ تَقُوْلَ اِنَّ عِلْمَ هَذِهِ الْخَمْسَةِ لاَ يَعْلَمُهَا اَحَدٌُ اِلاَّ اللهُ لَكِنْ يَّجُوْزَ اَنْ يَّعْلَمُهََا مَنْ يَّشَاءُ مِنْ مُحِبِّيْهِ وَاَوْ لِيَاءِ ه بِقَرِيْنَةِ قَوْلِهِ تَعَالَى اِنَّ اللهَ عَلِيْمٌُ خَبِيْرٌُ بَمَعْنِى الْمُخْبِرِ
-‘‘আপনি এ কথাও বলতে পারেন যে, এ পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে খোদা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। কিন্তু এও সঙ্গতঃ যে আল্লাহ তা’আলা তার ওলী ও প্রিয়জনদের মধ্যে যাকে/ যাদেরকে ইচ্ছে এ সমস্ত বিষয়ে অবহিত করেন। আয়াতের মধ্যেই এ কথার প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ আয়াতে উক্ত হয়েছে- (اِنَّ اللهَ عَلِيْمٌُ خَبِيْرٌُ) আল্লাহ জ্ঞানী ও অবহিতকারী এ খরীরুন خَبِيْرٌُ শব্দটি মুখবিরুন مُخْبِرٌُ অবহিতকারী অর্থেই প্রয়োগ করা হয়েছে।’’
{আল্লামা মোল্লা জিওনঃ তাফসীরে আহমদিয়াঃ পৃ. ৬০৮}
❏ তাফসীরে সাবীতে আয়াতাংশ
{সূরাঃ লোকমান, আয়াতঃ ৩৪, পারাঃ ২১}
مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে
اَىْ مِنْ حَيْثُ ذَا تِهَا وَاَمَّا بِاِ عْلاَمِ اللهِ لِلْعَبْدِ فَلاَ مَانِعَ مِنْهُ كَالْاَنْبِيَاءِ وَبَعْضِ اَلاَوْ لِيَاءِ قَالَ تَعَالى وَلاَيُحِيْطُوْنَ بِشَيْئٍ مِنْ عِلْمِهِ اِلاَّ بِمَا شَاءُ قَالَ تَعَالَى فَلاَيُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ اَحَدًا اِلاَّ مَنِ اَرْتَضَى مِنْ رَّسُوْلٍ فَلاَ مَانِعَ مِنْ كَوْنِ اللهِ يُطْلِعُ بَعْضَ عِبَادِهِ الصَّلِحِيْنَ عَلَى بَعْضِ الْمُغَيِّبَاتِ فَتَكُوْنُ مُعْجِزَةً لِلنَّبِىِّ وَكَرَ امَةً لِلِوَلِىِّ وَلِذَالِكَ قَالَ الْعَلَمَاءُ الْحَقُّ اَنَّهُ لَمْ يَخْرُجْ نَبِيًُّنَا مِنَ الدُّنْيَا حَتَى اَطْلَعُهُ عُلَى تِلْكَ الْخَمْسِ
অর্থাৎ ওই সব বিষয় কেউ সত্ত্বাগতভাবে জ্ঞাত নয়, কিন্তু আল্লাহ কর্তৃক অবহিত করার ফল শ্রুতিতে জানার ব্যাপারে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা নেই। যেমন নবীগণ ও মুষ্টিমেয় ওলীগণ সে সমস্ত বিষয় জ্ঞাত হন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন- এসব লোক আল্লাহর জ্ঞানকে আয়ত্ত্ব করতে পারেন না, তবে যতটুকু আল্লাহ চান, ততটুকু পারেন। আরও ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ তার মনোনীত রাসূলগণ ছাড়া অন্য কারো নিকট তার রহস্যাবলী ও অদৃশ্য বিষয়াদি উন্মোচন করেন না। সুতরাং, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক তার কোন প্রিয় বান্দাকে কোন কোন অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবহিত করার ব্যাপারে কোনরূপ অন্তরায় নেই। অতএব জ্ঞানের প্রকাশ নবীর “মুজিযাও ওলীর ‘কারামত’ হিসাবে গণ্য হবে। এজন্য সুবিজ্ঞ আলিমগণ বলেন যে, সঠিক কথা হচ্ছে রাসূল (ﷺ) ইহজগত থেকে তাশরীফ নিয়ে যান নি, যতক্ষণ না পঞ্চবিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়েছে।
{ইমাম সাভীঃ তাফসীরে সাভীঃ ৩/২৬০ পৃ.}
❏ তাফছিরে আরাঈসুল বয়ানে আয়াতাংশ
{সূরাঃ লোকমান, আয়াতঃ ৩৪, পারাঃ ২১}
يَعْلَمُ مَا فِى الْاَرْحَامِ এর তাৎপর্য বিশেষণ প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ আছেঃ
سَمِعْتُ اَيْضًا مِنْ بَعْضِ الْاَوْلِيَاءِ اَنَّهُ اَخْبَرَ مَا فِي الرَّحْمِ مِنْ ذَكَرٍ وَّاُنْثَى وَرَئَيْتُ بِعَيْنِىْ مَااَخْبَرَ
-‘‘কোন কোন ওলীর কাছে শুনেছি যে তাঁরা গর্ভস্থিত শিশু ছেলে কি মেয়ে সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আগে ভাগেই বলে দিয়েছেন এবং আমি নিজের চোখে দেখেছি যে তারা যা বলেছেন তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি।’’
❏ ‘তাফসীরে রূহুল বয়ানে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখা আছেঃ
وَمَا رُوِىَ عَنِ الْاَنْبِيَا ءِ وَالْاَوْلِيَاءِ مِنَ الْاَخْبَارِ عَنِ الْغُيُوْبِ ِفَبِتَعْلِيْمِ اللهِ تَعَالْىَ اِمَّا بِطَرِيْقِ الْوَحِىْ اَوْ بِطَرِيْقِ اَلْاِلْهَاَمِ وَالْكَشْفِ وَكَذَا اَخْبَرَ بَعْضُ الْاَوْلِيَاءِ عَنْ نُزُوْلِ الْمَطْرِ وَاَخْبَرَ عَمَّافِيْ الَّرحْمِ مِنْ ذَكَرٍاَ وَّاُنْثَى فَوَقَعَ كَمَا اَخْبَرَ
-‘‘নবী ও ওলীগণ থেকে যে সব অদৃশ্য বিষয়াদির খবর আছে, সেগুলো খোদা কর্তৃক অবহিত করার ফলশ্রুতি স্বরূপ তথা ওহী ‘ইলহাম’ বা ‘কাশ্ফের’ মাধ্যমে তারা জ্ঞাত হন। যেমন- কোন কোন ওলী বৃষ্টি বর্ষণ সম্পর্কে পূর্বেই বলে দিয়েছেন। তারা যে রকম বলেছেন ঠিক সে রকমই হয়েছে।’’
{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৭/১০৫ পৃ.}
কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের পর্যালোচনা আমি ইতিপূর্বেই করেছি উহাও পঞ্চ জ্ঞানের অন্তভুর্ক্ত।
উপরোক্ত তাফসীর সমূহের ভাষ্য থেকে বোঝা গেল যে, আল্লাহ তা’আলা স্বীয় হাবীব আলাইহিস সালামকে পঞ্চ জ্ঞান দান করেছেন এবং এ আয়াতে খবীর خَبِيْرٌُ শব্দটি মুখবির مُخْبِرٌُ অর্থাৎ অবহিতকারী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরও অনেক তাফসীরের উদ্ধৃতি পেশ করা যেতে পারে। কিন্তু আলোচনা আর দীর্ঘায়িত না করে এখানেই শেষ করলাম। এখন বাকী রইল মিশকাত শরীফের কিতাবুল ঈমানের শুরুতে উল্লেখিত হাদীছটির প্রসঙ্গ, যেখানে বলা হয়েছে ওই পাঁচটির বিষয় সম্পর্কে কেউ জানে না। এখন উক্ত হাদীছের বিবিধ ভাষ্যের দিকে নজর দিন।
❏ ইমাম কুরতুবী (رحمة الله),
{ইমাম কুরতুবীর বক্তব্যটি হলো- وَقَالَ الْقُرْطُبِيُّ: مَنِ ادَّعَى عِلْمَ شَيْءٍ مِنْهَا غَيْرَ مُسْتَنِدٍ إِلَيْهِ - عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ - كَانَ كَاذِبًا فِي دَعْوَاهُ. -ইমাম কুরতুবী (رحمة الله) বলেন, সে মিথ্যুক বলে বিবেচিত যে বলবে হুযুর (ﷺ) কোন মাধ্যম ছাড়া পঞ্চ বিষয়ের ব্যাপারে জানেন। (সুত্রঃ মোল্লা আলী ক্বারী, মেরকাত, ১/৬৬পৃ. হাদিসঃ ৩ দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রকাশ.১৪২২হি.) আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) ওলীরাও জানেন কাশ্ফের মাধ্যমে সে প্রসঙ্গে বলেন- وَمَا ذَكَرَهُ بَعْضُ الْأَوْلِيَاءِ مِنْ بَابِ الْكَرَامَةِ بِأَخْبَارِ بَعْضِ الْجُزْئِيَّاتِ مِنْ مَضْمُونِ كُلِّيَّاتِ الْآيَةِ، فَلَعَلَّهُ بِطَرِيقِ الْمُكَاشَفَةِ أَوِ الْإِلْهَامِ أَوِ الْمَنَامِ الَّتِي هِيَ ظَنِّيَّاتٌ لَا تُسَمَّى عُلُومًا يَقِينَيَّاتٍ، - (মেরকাত, প্রাগুক্ত)‘‘}
❏ইমাম আইনী (رحمة الله) ও ইমাম কুস্তালানী (رحمة الله) বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ এবং মোল্লা আলী কারী (رحمة الله) মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘মিরকাতের কিতাবুল ঈমানের ১ম পরিচ্ছেদ ঐ হাদীছের প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করেছেনঃ
فَمَنِ ادَّ عَى عِلْمَ شَيْئٍ مِنْهَا غَيْرَ مُسْنَدٍ اِلَى رَسُولِ للهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ كَاذِ بًافِىْ دُّعْوَاهُ
-‘‘সুতরাং, যে কেউ রাসূল (ﷺ)-এর মাধ্যম ছাড়া এ পঞ্চ বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবী করে সে স্বীয় দাবীতে মিথ্যুক।’’
{ক. আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীঃ উমদাদুল ক্বারীঃ কিতাবুল ঈমানঃ ১/২৯০ পৃ.
খ. আল্লামা ইমাম কুস্তালানীঃ ইরসাদুস সারীঃ কিতাবুল ঈমানঃ ১/১৪১ পৃ.
গ. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীঃ ফতহুল বারীঃ কিতাবুল ঈমানঃ ১/১২৪ পৃ.
ঘ. মোল্লা আলী ক্বারীঃ মিরকাতঃ ১/৬৫ পৃ.
ঙ. আল্লামা আলূসী বাগদাদীঃ তাফসীরে রুহুল মায়ানীঃ ২১/১১২ পৃ.}
❏ ‘আশিয়াতুল লুম‘আত’ গ্রন্থে শায়খ আব্দুল হক (رحمة الله) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,
المراد لا يعلم يدون تعليم الله
অর্থাৎ- ইহার দ্বারা উদ্দেশ্য এই পঞ্চ বিষয়ের জ্ঞান এক আল্লাহ তা’য়ালা জানানো বা শিক্ষা ছাড়া কেউ জানতে পারে না।
{ক. শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীঃ লুমআতঃ ৩/৭৩ পৃ.}
তিনি একটু অগ্রসর হয়ে বলেন-
مراد آنست كه بے تعليم الهى بحساب عقل اينها راندانداز امور غيب اند كه جز خداے تعا لى كے اں اند اند مگر انكه وى تعالى ازنزد خود كے رابوحى والهام بداناند
অর্থাৎ হাদীছের ভাবার্থ হলো এসব অদৃশ্য বিষয়ে আল্লাহ কর্তৃক অবহিত করা ছাড়া কেউ স্বীয় প্রজ্ঞা ও সহজাত জ্ঞানের বলে জ্ঞাত হতে পারে না। কেননা সেগুলো সম্পর্কে খোদা ব্যতীত আর কেউ জ্ঞাত নয়, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা যাকে ওহী কিংবা ইলহামের মাধ্যমে জানিয়ে দেন তিনিই জ্ঞাত হন।
{আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীঃ আশিয়াতুল লুমআতঃ ১/৪৪ পৃ.}
❏ ইমাম কুস্তালানী (رحمة الله) শরহে বুখারীর কিতাবুত তাফসীর সুরা ‘রা’দে উল্লেখ করেছেনঃ
لاَيَعْلَمُ مَتَى تَقُوْمُ الْسَّاعَةُ اِلاَّ اللهُ وَاِلاَّ مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُوْلِ فَاِنَّهُ يُطْلِعُهُ عَلَى غَيْبِهِ وَالْوَلِىُّ التَّابِعُ لَهُ يَا خُذُهُ عَنْهُ
অর্থাৎ- কিয়ামত কখন হবে এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তার মনোনীত রাসূল ছাড়া আর কেউ জানে না। কেননা মহাপ্রভু আল্লাহ তা’আলা স্বীয় রাসূলকে তাঁর গোপন রহস্যাবলী সম্পর্কে অবহিত করেন। সেই রাসূলের অনুসারী ওলী তাঁর (রাসূল)-এর নিকট থেকে সে জ্ঞান লাভ করেন।
{আল্লামা ইমাম কুস্তালানীঃ ইরশাদুস সারীঃ ৭/১৮৬ পৃ.}
انجاح لحاجه حاشيه ابن ما جه নামক গ্রন্থের اشراط الساعة শীর্ষক অধ্যায়ে এ হাদীছের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখা হয়েছেঃ
اَخْبَرَ الصِّدِّيْقُ زَوْجَتَهُ بِنْتَ خَارِجَةَ اَنَّهَا حَامِلَةُ بِنْتٍ فَوَلَدَتْ بَعْدَ وَفَاتِهِ اُمٌُ كُلْثُوْمِ بِنْتِ اَبِىْ بَكْرٍ فَهَذَا مِنَ الْفَرَاسَةِ وَالظَّنِّ وَيُصَدِّقُ اللهُ فُرَاسَةَ الْمُؤْ مِنِ
অর্থাৎ- হযরত সিদ্দীক আকবর (رضي الله عنه) নিজের স্ত্রী বিনতে হারিজাকে বলেছিলেন যে তিনি কন্যা সন্তান গর্ভধারণ করেছে। সিদ্দীক আকবেরর ওফাতের পর উম্মে কুলসুম বিনতে সিদ্দীক জন্মগ্রহণ করেন। এ খবরটি ছিল তার দিব্য জ্ঞান ও ধারণা প্রসূত। আল্লাহ তা’আলা মুমিনের দিব্য ধারণাকে সত্যে পরিণত করেন।
{হাশীয়ায়ে ইবনে মাযাহঃ ২৯৩, কাদীমী কুতুবখানা, করাচী, পাকিস্তান।}
+++++++++
জা’আল হক (প্রথমাংশ)
মূলঃ হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহে আলাইহে
অনুবাদকঃ (শাহজাদা) মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আলম ও মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।
তথ্য সংযােজনঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন