জা’আল হক (প্রথমাংশ)


প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াতের বিবরণ ২
---------------------

❏ আল্লামা মোল্লা আবদুর রহমান ইবন মোহাম্মদ দামেশকী (رحمة الله) ‘রিসালায়ে নাসিখ ও মানসুখ (رساله ناسخ ومنسوخ) নামক পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন-


وَمَا اَدْرِىْ مَا يُفْعَلُ بِىْ وَلاَبِكُمْ نُسِخَ بِقَوْلِهِ اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ


অর্থাৎ- অর্থাৎ مَااَدْرِىْ الخ. আয়াতটি اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে।


❏ ‘তাফসীরে খাযেনে’ এ আয়াত প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ


لَمَّا َنَزلَتْ هَذِهِ الْايَةُ فَرِحَ الْمُشْرِ كُوْنَ فَقَالُوْا وَاللاَّتُ وَالْعُزَّى مَا اَمَرَنَا وَاَمْرُ مُحَمَّدٍ اِلاَّوَاحِدً اوَمَالَهُ عَلَيْنَا مِنْ مَّزِيَّةٍ وَفَضْلٍ لَوْلاَ اَنَّهُ مَابْتَدَعَ مَا يَقُوْلُهُ لاَخْبَرَهُ الَّذِىْ بَعَثَهُ بِمَا يُفْعَلُ بِهِ فَاَنْزَلَ اللهُ عَزَّوَجَلَّ لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ (الاية) فَقَالَتِ الصَّحَبَةُ هَنِيْئًالَكَ يَانَبِىَّ اللهِ قَدْ عَلِمْتَ مَا يَفْعَلُ بِكَ فَمَا ذَا يَفْعَلُ بِنَا فَانْزَلَ اللهُ لِيُدْخِلَ الْمُؤْ مِنِيْنَ والْمُؤْمِنِاتِ جَنَّتِ (الاية) وَاَنْزَلَ وَبَشِّرِ الْمُؤْ مِنِيْنَ بِاَنَّ لَهُمْ مِنَ اللهِ فَضْلاً كَبِيْرًا وَهَذَا قَوْلُ اَنْسٍ وَقَتَادَةَ وَعِكِرَمَةَ قَالْوا اِنَّمَا هَذَا قَبْلَ اَنْ يُّخْبَرَ بِغَفْرَانِ ذَنْبِهِ وَاِنَّمَا اُخْبِرَ بِغَفْرَانِ ذَنْبِهِ عَامَ الْحُدَيْبِيَّةِ فَنُسِخَ ذَلِكَ


অর্থাৎ- যখন আয়াতটি নাযিল হয়, তখন মুশরিকগণ খুশী হয়ে বলতে লাগলো লাত ও উয্যা মূর্তিদ্বয়ের শপথ! আমাদের ও মুহাম্মদ (ﷺ) এর একই অবস্থা; আমাদের উপর তাঁর কোন প্রাধান্য বা অন্য কোন মর্যাদা নেই। যদি রাসূল (ﷺ) কুরআনের কালামসমূহে নিজেই রচনা করে না বলতেন, তাহলে তার প্রেরক খোদা তা’আলা অবশ্যই বলে দিতেন যে, তাঁর সঙ্গে কিরূপ আচরণ করবেন। তখন আল্লাহ তা’আলা لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ الخ. আয়াতটি নাযিল করলেন। তখন সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ)! আপনাকে মুবারকবাদ জানাই, আপনি তো জেনে ফেললেন, আপনার সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করা হবে। কিন্তু আমাদের কি গতি হবে? তখন আল্লাহ তা’আলা


 لِيُدْخِلَ الْمُؤْ مِنِيْنَ  َوالْمُؤْمِنِاتِ جَنَّتِ


(আল্লাহ মুসলমান পুরুষ ও স্ত্রীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন) আয়াতটি নাযিল করলেন। এবং


 وَبَشِّرِ الْمُؤْ مِنِيْنَ بِاَنَّ لَهُمْ مِنَ اللهِ فَضْلاً كَبِيْرًا


(মুমিনদেরকে এ শুভ সংবাদ দিন যে, তাঁদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ মেহেরবাণী আছে) আয়াতটিও নাযিল করলেন।


❏ হযরত আনাস, কাতদা ও ইকরামা (رضي الله عنه) এ মত পোষণ করেন। তাঁদের অভিমত হলো এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল ওই আয়াতের আগে, যে আয়াতে  রাসূল (ﷺ)-এর মাগফিরাতের খবর দেয়া হয়েছে। রাসূল (ﷺ) হুদায়বিয়ার সন্ধির বছরই তাঁকে এ খবর দেয়া হয়েছিল। সুতরাং, এ আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে।)

{ইমাম খাযেন, তাফসীরে খাযেনঃ ২



কেউ প্রশ্ন করতে পারেন لاَاَدْرِىْ আয়াতটি একটি ‘বিবরণাত্মক বাক্য’ এবং খবর বা বিবরণ রহিত হতে পারে না। এর কয়েকটি উত্তর আছে প্রথমতঃ উলামায়ে কিরামের অনেকেই খবর রহিত হওয়ার বৈধতার সপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন,


❏ যেমন وَاِنْ تُبْدُوْا الخ আয়াতটি لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا الخ আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে। 

{সূরাঃ বাক্বারা, আয়াতঃ ২৮৬, পারাঃ ৩}



❏ অনুরূপ لاَاَدْرِىْ الخِ আয়াতটিকে হযরত আব্বাস, আনাস ও ইবন মালিক اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ الخ আয়াত দ্বারা রহিত বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। 

{ক. ইমাম ফখরুদ্দীন রাজীঃ তাফসীরে কবীরঃ ১০/৯ পৃ.

খ. ইমাম জালালুদ্দীন সূয়তীঃ তাফসীরে দুররে মানসূরঃ ৭/৩৭৭-৩৭৮ পৃ.

গ. ইমাম আবুস সাউদঃ তাফসীরে আবুস সাউদঃ ৬/৬৯ পৃ.}

(তাফসীরে কবীর, দুররে মনসুর ও আবুস সাউদ দ্রষ্টব্য)


দ্বিতীয়ত এ আয়াতে قُلْ لاَاَدْرِىْ  শব্দ দ্বারা যেহেতু নির্দেশ বুঝায় সেহেতু এর সাথেই রহিত হওয়ার ব্যাপাটি সম্পর্কিত।

{সূরাঃ বাক্বারা, আয়াতঃ ১৮৩, পারাঃ ২}



তৃতীয়তঃ কোন কোন আয়াত আকারের দিক দিয়ে বিবৃতিমূলক বাক্যের মত দেখা যায়, কিন্তু অন্তনির্হিত তাৎপর্যের দিক দিয়ে বিবৃতিমূলক বাক্যের মত দেখা যায়, কিন্তু অন্তনির্হিত তাৎপর্যের দিক থেকে ‘আদেশসূচক বাক্য’ রূপে গণ্য হয়।

যেমন كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ – لِلَّهِ عُلىَ النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ.{সূরাঃ আলে ইমরান, আয়াতঃ ৯৭, পারাঃ ৪} ইত্যাদি।


এ ধরনের আয়াত সমূহ রহিত হওয়া জায়েয। চতুর্থতঃ এ আপত্তিটা আমাদের উপর প্রযোজ্য নয়, বরং সে সব তাফসীর ও হাদীছ সম্পর্কে প্রযোজ্য, যা দ্বারা ‘খবর’ রহিত হওয়ার বিষয় প্রমাণিত হয়েছে।


যদি এ আয়াতের উপরোক্ত মর্মার্থ গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আয়াতের বাহ্যিক শাব্দিক অর্থ অনেক হাদীছের বিপরীত হবে।


❏ হুযুর আলাইসি সালাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন প্রশংসার ঝান্ডা لِوَ اءُ الْحَمْدِ আমার হাতেই থাকবে।’

হযরত আদম আলাইহিস সালাম) ও সকল আদম সন্তান-সন্ততি আমার পতাকাতলে অবস্থান গ্রহণ করবেন। শাফাআতে কুবরা অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আমিই সুপারিশ করবো। আমার হাউয এ রকম হবে, এর পানপাত্র এ রকম হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।


❏ হযরত আবু বকর (رضي الله عنه) বেহেশতী ও হযরত হাসান ও হুসাইন (رضي الله عنه) বেহেশতে নওজোয়ানদের নেতা, হযরত ফাতিমা যুহরা (رضي الله عنه) জান্নাতে মেয়েদের নেত্রী। কাউকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘তুমি জাহান্নামী।’ জনৈক ব্যক্তি খুবই উত্তমরূপে জিহাদ করছিল, সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করলেন। কিন্তু  রাসূল (ﷺ) ফরমালেন ‘সে জাহান্নামী। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে যে, সে আত্মহত্যা করেছিল।


যদি নাউযুবিল্লাহ!  রাসূল (ﷺ)-এর নিজের খবর না থাকে, তাহলে নিজের ও অন্যান্যদের এসব খবর কিভাবে শোনাচ্ছেন? রাসূল (ﷺ) যার ঈমান রেজিষ্ট্রি করবেন, তিনি কামিল ঈমানদার। এখানে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু বক্তব্য সংক্ষেপণ করার উদ্দেশ্যে এখানে ক্ষান্ত হলাম। খোদা সবাইকে বিষয়টি উপলব্ধি করার শীক্ত দান করুন। আমীন।



(৯)  لاَ تَعْلَمُهُمْ . نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ.


-‘‘আপনি তাদেরকে জানেন না, আমি তাদেরকে জানি।’’

{সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ১০১,পারাঃ ১১}


এ আয়াতে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীগণ আরও একটি প্রমাণ্য দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে  রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে আগত মুনাফিকদেরকে রাসূল (ﷺ) চিনতেন না। তাই ইলমে গায়বের প্রশ্ন উঠতে পারে কিভাবে? তাফসীরকারকগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, এ আয়াতের পরেই وَلِتَعْرِ فََهُمْ فِىْ لَحْنِ الْقَوْلِ.

(এবং নিশ্চয় তাদের কথার ধরন থেকে তাদেরকে চিনে ফেলবেন)

{সূরাঃ মুহাম্মদ, আয়াতঃ৩০, পারাঃ২৬}



আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। সুতরাং, এ আয়াতটি রহিত হিসেবে গণ্য হয়। অথবা এরকম ব্যাখ্যাও হতে পারে যে আমি (আল্লাহ বাতলিয়ে না দিলে আপনি (হে নবী (ﷺ)) তাদেরকে চিনতেন না।



❏ ‘তাফসীরে জুমালে’ এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে লিখা হয়েছেঃ


فَاِنْ قُلْتَ كَيْفَ نُفِىَ عَنْهُ عِلْمٌُ بِحَالِ الْمُنَافِقِيْنَ وَاَثْبَتَهُ فِىْ قَوْلِهِ تَعَالَى وَلَتَعْرِ فَنَّهُمْ فِىْ لَحْنِ الْقَوْلِ فَالْجَوَابُ اَنَّ اَيَةَ النَّفِىَ نَزَلَتْ فَبْلَ اَيَةِ الْاِثْبَاتِ


অর্থাৎ- প্রশ্ন করতে পারেন যে,  রাসূল (ﷺ) কর্তৃক মুনাফিকদের অবস্থা জানার বিষয়টি কেন অস্বীকার করা হলো? অথচ وَلَتَعْرِ فَنَّهُمْ فِىْ لَحْنِ الْقَوْلِ. আয়াতে তাঁর জানার স্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়েছে। এর জওয়াব হলো অস্বীকৃতিসূচক আয়াতটি স্বীকৃতিসূচক আয়াতের আগে অবতীর্ণ হয়েছিল।


❏ একই ‘জুমালে’ وَلَتَعْرِ فَنَّهُمْ فِىْ لَحْنِ الْقَوْلِ. আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখিত আছেঃ


فَكَانَ بَعْدَ ذَلِكَ لاَيَتَكَلًَّمُ مُنَافِقً عِنْدَ النَّبِىِّ عَلَيْهِ السَّلاَمُ اِلاَّعَرَفَهُ وَيَسْتَدِلُّ عَلَى فَسَادِ بَاطِنِهِ وَنِفَاقِهِ


অর্থাৎ- আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে মুনাফিকদের  রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে কথা বলতেই রাসূল (ﷺ) তাদরেকে চিনে ফেলতেন এবং তাদের অন্তরের অসৎ উদ্দেশ্য ও কপটতার পরিচায়ক প্রমাণও উপস্থাপিত করতেন।


❏ ‘তাফসীরে বায়যাবীতে’ এ আয়াত প্রসঙ্গে লিখা আছেঃ


خَفِىَ عُلَيْكَ حَالُهُمْ مَعَ كَمَالِ فِطْنَتِكَ وَصِدْقِ فَرَاسَتِكَ


অর্থাৎ- আপনার পূর্ণবোধশক্তি ও মানুষ চিনার সঠিক প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তাদের (মুনাফিকদের) অবস্থা আপনার নিকট গোপন রয়ে গেছে।

{ইমাম নাসিরুদ্দিন বায়যাভীঃ তাফসিরে বায়যাভিঃ ৩/১৬৯ পৃ.}



এ তাফসীর থেকে বোঝা গেল যে, এ আয়াতে অনুমান ও আন্দাজের ভিত্তিতে জানার বিষয়টির অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়েছে। আয়াতের এ ধরনের ব্যাখ্যাবলী গ্রহণ করা না হলে, এটা সমস্ত হাদীছের বিপরীত হয়ে যাবে, যেগুলোতে একথা প্রমাণিত যে হুযুর আলাইহস সালাম মুনাফিকদেরকে চিনতেন, কিন্তু জেনে শুনেও তাদের অবস্থা গোপন করতেন।


❏ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘আইনী’র ৪র্থ খন্ডের ২২১ পৃষ্ঠায় হযরত ইবন মসউদ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত আছেঃ


خَطَبَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ يَوْمَ الْجَمْعَةِ فَقَالَ اُخْرُجْ يَافُلاَنُ فَاِنَّكَ مُنَافِقٌُ فَاَخْرَجَ مِنْهُمْ نَاسًا فَفَضَحَهُمْ


-‘‘ রাসূল (ﷺ) জুমা’র দিন খুতবা পাঠ করছিলেন। অতঃপর নাম উল্লেখপূর্বক বললেন, হে অমুক, বের হয়ে যাও। কেননা, তুমি মুনাফিক। এ রকম করে অনেক ব্যক্তিকে অপদস্থ করে বের করে দিয়েছিলেন।’’


❏ আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) রচিত ‘শরহে শিফা’ এর ১ম খন্ডের ২৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছেঃ


عَنْ اِبْنِ عَبَّاسٍ كَانَ الْمُنَفِقُوْنِ مِنَ الرِّجَالِ ثَلَثَةَ مِاَئَةٍ وَمِنَ النِّسَاءِ مِاَئْةً وَّسَبْعِيْنَ


-‘‘হযরত ইবন আব্বাস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত যে মুনাফিকদের পুরুষের সংখ্যা ছিল তিনশ, আর মহিলার সংখ্যা ছিল একশত সত্তর।’’


আমি ইতোপূর্বে ইলমে গায়বের সমর্থনে একটি হাদীছ পেশ করেছি।


❏ উক্ত হাদীছে  রাসূল (ﷺ) বলেছেন- ‘আমার সামনে আমার সমস্ত উম্মতকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমি তাদের মধ্যে মুনাফিক, কাফির ও মুমিনগণকে চিহ্নিত করেছি। এতে মুনাফিকগণ আপত্তি উত্থাপন করলো। তখন তাদের আপত্তির জওয়াবে কুরআনের আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়। বলা বাহুল্য, যাবতীয় দলীল সমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্যে এরূপ প্রায়োগিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন। অধিকন্তু, আয়াতে বর্ণিত বক্তব্য সাধারণত ক্ষোভ প্রকাশের জন্য করা হয়ে থাকে। বাপ নিজ শিশুকে শস্তি দিবার সময় কেউ যদি রক্ষা করে তখন তিনি বলেন, এ অসভ্যকে তুমি চিন না, আমি ভালরূপে চিনি। এতে জ্ঞানের অস্বীকৃতি বুঝায় না।


(১০)  وَلاَتُصَلِّ عَلَى اَحَدٍ مِّنْهُمْ مَاتَ اَبَدًا


❏ ‘‘তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে আপনি কখনও জানাযার নামায পড়বেন না।’’

{সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ৮৪, পারাঃ ১০}


❏ রাসূল (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন উবাই নামক কট্টর মুনাফিকের জানাযার নামায পড়েছিলেন কিংবা পড়তে চেয়েছিলেন। এমন সময় হযরত ফারূকে আজম (رضي الله عنه) নামায না পড়তে অনুরোধ করলেন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) অনুরোধ রক্ষা করলেন না। তখনই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, যেখানে তাঁকে মুনাফিকদের জানাযার নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে।


যদি তাঁর ইলমে গায়ব থাকতো, তাহলে তিনি মুনাফিকের জানাযার নামায পড়লেন কেন?


এর উত্তর হচ্ছে, হযরত আব্বাস (رضي الله عنه) এ মুনাফিকের নিকট একটু ঋণী ছিলেন, এবং তার ছেলে কিন্তু খাঁটি মুমিন ছিলেন। উক্ত মুনাফিক নিজে ওসীয়ত করে গিয়েছিল যে তার জানাযার নামায যেন  রাসূল (ﷺ) পড়ান। সে সময় পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সুতরাং, তখনকার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাপ্ত অনুমতি অনুসারে রাসূল (ﷺ) আমল করেছিলেন।

তাফসীরে কবীর  ও রূহুল বয়ানে উল্লেখিত আছে যে, তার ওসীয়ত দ্বারা তার তাওবাই প্রমাণিত হয়।

{ইমাম ফখরুদ্দিন রাজীঃ তাফসিরে কাবিরঃ ৬/১১৬পৃ.}


শরীয়তের হুকুম বাহ্যিক দিকের উপর বর্তায়।  রাসূল (ﷺ) সে অনুযায়ী আমল করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা ছিল না যে তাঁর হাবিব দুশমন বাহ্যিক দৃষ্টিতে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হোক। তাই কুরআন করীম হযরত ফারুক (رضي الله عنه) এর মতের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। মোটকথা, এ বিষয়টি ইলমে গায়বের সহিত মোটেই সম্পৃক্ত নয়। আবদুল্লাহর মুনাফিক হওয়ার বিষয়টি সবার জন্য ছিল। তবুও তার জানাযার নামায আদায়ের মধ্যে অনেক কল্যাণময় দিক ছিল। দয়াময়ের বাদন্যতা ও মহানুভবতা অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রকাশ পেয়ে যায়। তা’ না হলে ইহা কিভাবে সম্ভবপর হতে পারে যে হযরত ফারুকে আজম (رضي الله عنه) যা’ জানতে পারলেন, তা’ হুজুর আলাইহিস সালাম জানতে পারলেন না?



(১১) وَيَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الرُّوْحِ. قُلِ الرَّوْحُ مِنْ اَمْرِ رَبِّىْ وَمَا اُوْتِيْتُمْ مِنَ الْعِلْمِ اِلاَّقَلِيْلاً


‘‘আপনার কাছে এরা আত্মার কথা জিজ্ঞাসা করছে, আপনি বলুন আত্মা হচ্ছে খোদার হুকুমে সৃষ্ট সূক্ষ্ম বস্তু। এবং তোমরা মাত্র যৎসামান্য জ্ঞানই লাভ করেছ।’’

{সূরাঃ বনী ইসরাঈল, আয়াতঃ ৮৫, পারাঃ ১৫}


বিরুদ্ধ মতাবলম্বীগণ এ আয়াতটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন, আত্মা কি,  রাসূল (ﷺ)-এর সে জ্ঞান ছিল না। সুতরাং, হুযুর (ﷺ) সম্পূর্ণ ইলম গায়বের অধিকারী হন নি। এখানে তিনটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার।


প্রথমতঃ এ আয়াতে এ কথা কোথায় আছে যে ‘আমি (আল্লাহ) হুযুর আলাইহিস সারামকে আত্মার জ্ঞান দান করিনি”? আর হুজুর আলাইহিস সালামই বা কোথায় বলেছেন, ‘আত্মা সম্পর্কে আমি জ্ঞাত নই। সুতরাং, এ আয়াতকে আত্মা সম্পর্কিত জ্ঞানের অস্বীকৃতিসূচক দলীল হিসেবে গ্রহণ করাটাই ভুল। এখানে তো প্রশ্নকারী কাফিরদেরকে বলা হয়েছে, ‘তোমাদেরকে যৎসামান্য জ্ঞান দান করা হয়েছে, আত্মার মূলতত্ত্বের জ্ঞান তোমাদের নেই।’


দ্বিতীয়তঃ

❏ হযরত কিবলায়ে আলম শাইখ মেহর আলী শাহ সাহেব ফাযেলে গোলড়বী (رحمة الله) তার রচিত ‘সাইফে চিশতীয়া নামক কিতাবে হযরত মুহিউদ্দীন ইবন আরবীর উদ্ধৃতি দিয়েঃ

 قُلِ الرَّوْحُ مِنْ اَمْرِ رَبِّىْ

এর ব্যাখ্যা করেছেনঃ বলে দিন, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশে সৃষ্ট।


অর্থাৎ আলম বা জগত অনেক আছে। যথা ‘আলমে আনাসির’ (জড় জগত), ‘আলমে আরওয়াহ’ (আত্মিক জগত) আলমে আমর, আলমে ইমকান’ ইত্যাদি সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম জগত। রূহ হচ্ছে আলমে আমরের অন্তভুর্ক্ত আর তোমরা হচ্ছ আলমে আনাসিরের আওতাভুক্ত। তাই তোমরা এর মূলতত্ত্ব বা স্বরূপ জানেত পারবে না। কেননা, (ওহে কাফিরগণ) তোমরা তো যৎকিঞ্চিত জ্ঞানের অধিকারী মাত্র।


❏ তাফসীরে ‘রূহুল বয়ানে’ আয়াত 

لاَتَدْرِ كُهُ الْاَ الاْبَصَارُ وَهُوَيُدْرِكُ الْاَبْصَارَ

{সূরাঃ আ’রাফ, আয়াতঃ ১০৩, পারাঃ ৭}

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখিত আছেঃ


لاَنَّهُ تَجَاوَزَفِىْ تِلْكَ اللَّيْلَةِ عَنْ عَالَمِ الْعَنَاصِرِ ثُمَّ عَنْ عَالَمِ الطَّبْعِيَّةِ ثُمْ عَنْ عَالَمِ الْاَرْوَاحِ حَتَّى وَصَلَ اِلَى عَالَمِ الْاَمْرِوَعَيْنُ النَّأسِ مِنْ عَالَمِ الْاَجْسَامِ فَاَنْسَلَخَ عَنِ آلْكُلِّ وَرَائَى رَبَّهُ بِالْكُلِّ


অর্থাৎ-  রাসূল (ﷺ) মিরাজের রাতে ‘আলমে আনাসির’ থেকে অগ্রসর হয়ে ‘আলমে তাবীয়াত’ অতঃপর ‘আলমে আরওয়াহ’ অতিক্রম করে সর্বশেষে ‘আলমে আমর পর্যন্ত পৌঁছেন। শরীরের এ চর্মচোখ ‘আলমে আজসামের’ অন্তভুর্ক্ত বিধায় তিনি (ﷺ) এ জগতের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য থেকে পৃথক হয়ে যান এবং মহান আল্লাহ তা’আলাকে তাঁর সর্বসত্ত্বা দিয়ে অবলোকন করেন।

{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৩/১০০ পৃ.}


এ থেকে বোঝা গেল যে,  রাসূল (ﷺ) মিরাজের রাতে শুধু যে ‘আলমে আমর’ পরিভ্রমণ করেছেন, তা নয়, বরং নিজেও ‘আলমে আমরের’ অন্তভুর্ক্ত হয়ে যান এবং স্বীয় প্রতিপালককে অবলোকন করেন। আর সেই আলমে আমরের অন্তভুর্ক্ত হচ্ছে আত্মা বা রূহ। এমতাবস্তায় আত্মা রাসূল (ﷺ) কাছে গোপন থাকতে পারে কি? আমরা যেরূপ এ জগতের শারীরিক কাঠামোসমূহ দেখেই পরিচয় পাই, রাসূল (ﷺ)ও অনুরূপভাবেই আত্মার পরিচয় লাভ করেন। কারণ রূহও সে একই ‘আলমে আমর’ এর অন্তভুর্ক্ত।


❏ হযরত ঈসা (عليه السلام) অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক রূহ সম্পন্ন ছিলেন কেননা, হযরত মারয়াম (رضي الله عنه) ছিলেন মানবী, আর হযরত জিব্রাইল (عليه السلام) হচ্ছেন রূহ। কুরআনেই আছে فَاَرْسَلْنَا اِلَيْهَا رُوْحَنَا (আমি হযরত মারয়ামের কাছে আমার রূহ অর্থাৎ জিব্রাইল (عليه السلام) কে পাঠিয়ে ছিলাম।) এবং তাঁর ঈসা (عليه السلام) সৃষ্টি হয়েছিল হযরত জিব্রাইলের ফুঁক থেকে। এ জন্য রূহ ও মানব এ উভয়ের বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান আছে তাঁর মধ্যে।


❏ ‘ফুতুহাতে মক্কিয়া’ কিতাবের ৫৭৫ অধ্যায়ে শাইখ আকবর (رحمة الله) ফরমানঃ


فَكَانَ نِصْفَهُ بَشَرًا وَنِصْفُهُ الْاَخَرُرَوْحًا مُطَهَّرًا مَلَكًا لِاَنَّ جِبْرِيْلَ وَهَبَهُ لِمَرْيَمَ


অর্থাৎ- হযরত ঈসা (عليه السلام) হচ্ছেন অর্ধেক মানব এবং অপর অর্ধেক পূত পবিত্র আত্মবিশিষ্ট। কেননা তাঁকে জিব্রাইল (عليه السلام) হযরত মারয়ামের নিকট অর্পণ করেছেন।"

তাঁর সৃষ্টিও  রাসূল (ﷺ)-এর নুর থেকে। তাই  রাসূল (ﷺ) হচ্ছেন যেন আপাদমস্তক রূহ (আত্মা)


❏ তাফসীরে রূহুল বয়ানে’ لاَتُدْركُ الخ আয়াতের তাৎপর্য বিশে­ষণ প্রসঙ্গে আরও লিখা হয়েছেঃ


اَلْحَقِيْقَتُ الْمُحَمَّدِيَّهُ هِىَ حَقِيْقَةُ الْحَقَائِقِ وَهُوَ الْمَوْجُوْدُ الْعَامُّ الشَّامِلْ


-‘‘হাকীকতে মুহাম্মদীয়া সমস্ত হাকীকতের হাকীকত এবং উহাই সমগ্র সৃষ্টিতেই ব্যাপৃত।’’

{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৩/১০১ পৃ.}



সুতরাং, উক্ত আয়াতের অর্থ হল রূহ হচ্ছে, যা’ নির্দেশসূচক كُنْ ‘কুন’ এর ফলশ্রুতিতে সরাসরি প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্ট হয় এবং উহাই হচ্ছে হাকীকতে মুহাম্মদীয়া, যাঁর সৃষ্টি হলো সরাসরি মাধ্যম ছাড়াই আর বাকী সব কিছুর সৃষ্টি তাঁর নূর থেকে। মোদ্দাকথা হচ্ছে, রাসূল (ﷺ) হচ্ছেন জগতের ‘হাকীকী রূহ’।


❏ ‘তাফসীরে কবীরে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ এখানে ‘রূহ’ শব্দ প্রয়োগ করে কুরআন বা হযরত জিব্রাইল (عليه السلام) এর প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। কাফিরগণ প্রশ্ন করেছিল, কুরআন কি, কবিতা, না মনগড়া কাহিনী? বা জিব্রাইল কে, এবং এখানে কিভাবে আসেন তিনি? উত্তর দেয়া হয়েছে, কুরআন হচ্ছে খোদার নির্দেশাবলী, কবিতা কিংবা যাদু নয়। আর জিব্রাইল (عليه السلام) খোদার হুকুমেই আসেন।


❏ কুরআনেই বলা হয়েছে وَمَانَتَنَزَّلُ اِلاَّ بِاَمْرِرَبِّك. (আপনার প্রভুর হুকুম ছাড়া তিনি অবতরণ করেন না।)

{সূরাঃ মায়াহিম, আয়াতঃ ৬৪, পারাঃ ১৬}



❏ উক্ত তাফসীরে কবীরে আরও বলা হয়েছেঃ


فَاِذَا كَانَ مَعْرِفَتُ اللهِ تَعَالَى مُمْكِنَةً بَلْ حَاصِلَةً فَاَىُّ مَانِعٍ يَمْنَعُ مِنْ مَّعْرِفَّةِ الرُّوْحِ


রাসূল (ﷺ) যখন খোদাকে চিনলেন, রূহকে কেন চিনবেন না? 

{ইমাম ফখরুদ্ধীন রাজীঃ তাফসীরে কবীরঃ ৭/৩৯২ পৃ.}




তৃতীয়তঃ তাফসীরকারক ও হাদীছবেত্তাগণ সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন যে  রাসূল (ﷺ)-এর রূহের জ্ঞান ছিল।


❏ ‘তাফসীরে খাযেনে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ


قِيْلَ اِنَّ النَّبِىَّ عَلَيْهِ السَّلاَمُ عَلِمَ مَعْنَى الرُّوْحِ لَكِنْ لَّمْ يُخْبِرْ بِهِ لِاَنْ تَرْكَ الْاَخْبَارِ كَانَ عَلَمًا لِنُبُوَّتِهِ وَالْقَوْلُ الْاَصَحُّ اَنَّ اللهَ اِسْتَاثَرَ بِعِلْمِ الرُّوْحِ


অর্থাৎ- বলা হয়েছে যে, নবী আলাইহিস সালামের রূহের স্বরূপ জানা ছিল, কিন্তু এ সম্পর্কে কিছু বলেন নি। কেননা, না বলাটাই ছিলো তাঁর নবুওয়াতের আলামত। এ প্রসঙ্গে সর্বাধিক সঠিক মত হলো যে রূহের জ্ঞান আল্লাহর সহিত বিশেষভাবে সম্পর্ক যুক্ত।

{ইমাম খাযেনঃ তাফসীরে লুবাবুত তা’ভীলঃ ৩/১৪৫ পৃ.}



এ ইবারতে রূহ সম্পর্কিত জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদানকারীকে ‘মুশরিক’ বলা হয়নি বা তাদের মতকেও ভুল বলা হয়নি।


❏ তাফসীরে ‘রূহুল বয়ানে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছেঃ


جَلَّ مَنْصَبُ حَبِيْبِ اللهِ اَنْ يَكُوْنَ جَاهِلاً بِالرُّوْحِ مَعَ اَنَّهُ عَالِمٌُ بِاللهِ وَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَيْهِ بِقَوْلِهِ وَعَلَّمَكَ مَالَمْ تَكُنْ تَعْلَمْ


অর্থাৎ-  রাসূল (ﷺ) রূহ সম্পর্কে অনবহিত, অথচ আল্লাহ সম্পর্কে অবগত- এ ধরনের অশোভন উক্তি রাসূল (ﷺ) ক্ষেত্রে খাটে না। মহা প্রভু তাঁর প্রতি স্বীয় অসীম অনুগ্রহের উল্লেখপূর্বক ইরশাদ করেছেন যে, ‘যা’ কিছু আপনি জানতেন না, তা আপনাকে অবহিত করেছি’।

{আল্লামা ইসমাঈল হাক্কীঃ তাফসীরে রুহুল বায়ানঃ ৫/২৩৫ পৃ.}


❏ ‘তাফসীরে মাদারিকে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আছেঃ


وَقِيْلَ كَانَ السَّوَالُ عَنْ خَلْقِ الرُّوْحِ يَعْنِىْ هُوَ مَخْلُوْقَّ اَمْ لاَ وَقَوْلُهًُ مِنْ اَمْرِ رَبِّىْ دَلِيْلُ خَلْقِ الرُّوْحِ فَكَانَ جَوَاباً


অর্থাৎ- বলা হয়েছে যে, এখানে প্রশ্নটি ছিল রূহের সৃষ্টি সম্পর্কে। অর্থাৎ রূহ সৃষ্টির অন্তভুর্ক্ত কিনা? আল্লাহর ইরশাদ مِنْ اَمْرِ رَبِّىْ দ্বারা রূহ সৃষ্ট বলেই প্রমাণিত হল। সুতরাং, এটি হচ্ছে তাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর।

{ইমাম নাসাফীঃ তাফসীরে মাদারিকঃ ১/৭২৭ পৃ.}



এ ইবারত থেকে বোঝা গেল যে, উক্ত আয়াতে রূহের জ্ঞান থাকা, না থাকার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি, বরং এখানে আলোচনা হয়েছে রূহের মাখলুক (সৃষ্ট) হওয়া সম্পর্কিত বিষয়ে।


❏ ‘মাদারেজুন নাবুওয়াতের’ দ্বিতীয় খন্ডের ৪০ পৃষ্ঠায়ঃ

وصل ايزارسانى كفار فقراء صحابه را. শীর্ষক পরিচ্ছেদে শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী (رحمة الله) উল্লেখ করেছেনঃ


چه گونه جرأت كند مؤمن عارف كه نفى عالم بحقيقت روح ازسيد المرسلين وامام العار فين كند وداده است اورا حق سبحانه علم ذات وصفات خود وفتح كرده بر ائے او فتح مبين ازعلوم اولين وآخرين روح انسانى چه باشد كه درجنب جامعيت وے قطره ايست از دريا وذره ايست ازبيدا


অর্থাৎ- একজন ‘আরিফ’ মুমিন  রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে রূহের মৌলতত্ত্ব সম্পর্কিত জ্ঞানের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার ধৃষ্টতা কিরূপে প্রদর্শন করতে পারেন? যখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে (হুযুর) স্বীয় সত্ত্বা ও গুণাবলীর জ্ঞান দান করেছেন, তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল জ্ঞানের জ্ঞানভান্ডার তাঁর জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তাঁর ব্যাপক জ্ঞানের তুলনায় মানবাত্মা সম্পর্কিথ জ্ঞানের আর কতটুকুই বা বিশেষত্ব থাকতে পারে। এ’তো যেন সমুদ্রের এক কাতরা, বা সুবিস্তৃত প্রান্তরের একটি পরিমাণু সদৃশ মাত্র।


❏ সুবিখ্যাত ‘ইহয়াউল উলুম’ কিতাবে ইমাম গায্যালী (رحمة الله) লিপিবদ্ধ করেছেনঃ


وَلاَ تَظُنُّ اَنَّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ مَكْشُوْفًا لِرَسُوْلِ اللهِ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَاِنَّ مَنْ لَّمْ يَعْرِفُ نَفْسَهُ فَكَيْفَ يَعْرِفُا للهُ سُبْحَانَهُ فَلاَ يَبْعُدُ اَنْ يَّكُوْنَ ذَلِكَ مَكْشُوْفًا لِبَعْضِ الْاَوْلِيَاءِ وَاَلْعُلَمَاءِ


-‘‘একথা মনে করবেন না যে,  রাসূল (ﷺ)-এর নিকট রূহের রহস্য উৎঘাটিত হয়নি। কেননা, যে নিজেকে চিনতে পারে না, সে আল্লাহকে কিভাবে চিনতে পারে? কোন কোন ওলী ও আলেমে রব্বানীর নিকটও রূহের রহস্য উন্মোচনের ব্যাপারটি বিচিত্র কিছু নয়।’’

{ইমাম গাজ্জালীঃ ইহইউ উলুমুদ্দীনঃ ১/১১১ পৃ. দারুল মা‘রিফ, বৈরুত।}



উপরোক্ত ভাষ্যসমূহ থেকে বোঝা গেল যে,  রাসূল (ﷺ)কে রূহের জ্ঞান দান করা হয়েছে। অধিকন্তু, তারই বদৌলতে কোন কোন আলেম ও ওলীও এজ্ঞান লাভ করেছেন। কিছু সংখ্যক লোক এটা অস্বীকার করেছেন বটে, কিন্তু সে সম্পর্কে কোন দলীল প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নি। উপরন্তু, কোন বিষয়ে স্বীকৃতি সূচক ও অস্বীকৃতি জ্ঞাপন বিবিধ দলীল পাওয়া গেলে স্বীকৃতিসূচক প্রমাণ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। উসুলের বিধিবদ্ধ নিয়মই হচ্ছে এরূপ, যা’ পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে।



 (১২)عَفَا اللهُ عَنْكَ لِمَا اَذِنْتَ لَهُمْ


অর্থাৎ- “আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন” আপনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন কেন?

{সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ৪৩, পারাঃ ১০}।

+++++++++
জা’আল হক (প্রথমাংশ)

মূলঃ হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহে আলাইহে

অনুবাদকঃ (শাহজাদা) মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আলম ও মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।

তথ্য সংযােজনঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন