ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ইমামুল মুহাদ্দিসীন, হাফেযুল হাদীস, শায়খুল ফুক্বাহা ইমাম আবূ বকর বায়হাক্বী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বিভিন্ন ভলিয়ম সম্বলিত অনেক অনবদ্য গ্রন্থের রচয়িতা এবং ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিক্বহ্ এর পথিকৃৎ। তাঁর পূর্ণনাম হলো- আহমদ ইবনে হোসাঈন ইবনে আলী ইবনে মূসা। তাঁর কুনিয়াত (উপনাম) আবূ বকর। উপাধি খোরাসানী ও বায়হাক্বী।
◾ জন্ম:
তিনি নিশাপুরের ‘বায়হাক্ব’ অঞ্চলের খুসরাওযিরদ নামক স্থানে ৩৮৪ হিজরীর শা’বান মাসে জন্ম গ্রহণ করেন। ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান ইবনে আফ্ফান (رضي الله عنه)র খেলাফতকালে নিশাপুর ইসলামী খেলাফতের করায়ত্ব হয়েছিলো।
◾ শিক্ষাজীবন:
জীবনী গ্রন্থাবলীতে ইমাম বায়হাক্বীর পরিবার সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়না। যতটুকু জানা যায়, তাহলো- তিনি শৈশবকাল থেকে জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করেন এবং পনের বছর বয়স থেকেই হাদীস শরীফ শিক্ষা ও গবেষণায় ব্রতী হন।
◾ শিক্ষা অর্জন:
ইমাম বায়হাক্বী জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্রগুলোতে সফর করে যুগশ্রেষ্ঠ ফক্বীহ্, মুহাদ্দিস, দার্শনিক ও সূফীগণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে খোরাসান, ত্বূস, হামদান ও নুক্বানসহ নিজ মাতৃভুমির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে সফর করে যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের সান্নিধ্যে এসে নিজেকে আলোকিত করেন। অতঃপর তিনি পবিত্র হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা মুর্কারামাহ্ ও মদীনা মুনাওয়ারায় সফর করেন এবং এ দু’টি বরকতময় নগরীর প্রসিদ্ধ আলিমগণের নিকট থেকে ইল্মে দ্বীন অর্জন করেন। হজ্ব ও যিয়ারত শেষে তিনি জ্ঞানের রাজধানী বলে খ্যাত বাগদাদ ও কুফা এবং এ দু’-এর পার্শ্ববর্তী নগরীগুলোতে ইল্ম অর্জনে আত্মনিয়োগ করেন। জ্ঞানার্জনের এ দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে তিনি নিজ জন্মভ‚মি বায়হাক্বে ফিরে আসেন এবং কিতাব রচনায় রত হন।
◾ শিক্ষকমন্ডলী:
ইমাম বায়হাক্বীর শিক্ষকমন্ডলীর সংখ্যা প্রচুর। কারণ তিনি খুব অল্প বয়স থেকে জ্ঞানার্জনের সূচনা করেন। ইমাম সুব্কীর ভাষ্য মতে তাঁর শিক্ষকগণের সংখ্যা শতাধিক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেনঃ
১. আবূ আবদুল্লাহ্ হাকিম আন-নিশাপুরী (ওফাত-৪০৫হি.)। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে বায়হাক্বীর শিক্ষার্জনের প্রাথমিক দিকে। তাঁর থেকে তিনি সর্বাধিক উপকৃত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর রচিত ‘আস-সুনান আল-কুবরা’তে ৮,৪৯১টি হাদীস রেওয়ায়ত করেছেন।
২. আবুল ফাত্হ আল মারূযী আশ্ শাফে‘ঈ। তিনি ছিলেন শাফে‘ঈ মাযহাবের যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম এবং ফাত্ওয়া ও মুনাযারায় প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তাঁর থেকে ইমাম বায়হাক্বী ইল্মে ফিক্বহ্ অর্জন করেন। তিনি ছিলেন তাঁর ফিক্বহ্-এর ওস্তাদ। তাঁর থেকে তিনি হাদীসও সংগ্রহ করেছেন এবং তাঁর ‘সুনানে কুবরা’য় তাঁর থেকে ৬৫টি হাদীসও বর্ণনা করেছেন।
৩. আবদুল ক্বাহের আল বাগদাদী। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং শাফে‘ঈ মাযহাবের দিকপাল। তিনি প্রসিদ্ধ কিতাব الفرق بین الفِرق -এর রচয়িতা।
৪. আবূ সা‘ঈদ ইবনুল ফদ্বল আস্-সায়রফী। তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য তথা সেক্বাহ্ রাভী। ইমাম বায়হাক্বী তাঁর সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেন এবং অনেক হাদীস সংকলন করেন। ১১০৪টি হাদীস তিনি তাঁর থেকে ‘সুনানে কুবরা’য় বর্ণনা করেছেন।
৫. আবূ বকর ইবনে ফুরক। তাঁর থেকে তিনি ইলমে কালাম শিক্ষা করেন।
৬. আবু আলী আর রোযবারী। তিনি ছিলেন তাসাওফের একজন প্রসিদ্ধ শায়খ। তাঁরই হাতে তিনি বায়‘আত গ্রহণ করেন এবং ইলমে তরীক্বত ও তাসাওফের দীক্ষা লাভ করেন।
৭. ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আবূ ইসহাক্ব আল ইস্ফারাঈনী (ইন্তিক্বাল: ১০ মুহাররম, ৪১৮হি)
৮. ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহীম ইবনে ইয়ূসুফ আবূ ইসহাক্ব আল ফক্বীহ্। (ওফাত: রজব, ৪১১হি.)
৯. ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আবূ ইসহাক্ব আল আরমভী। (ওফাত: শাওয়াল, ৪১৮হি.)
১০. আহমদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে আহমদ ইবনে জানজাল। আবুল আব্বাস আস্ র্সারাম আল-মা’দিল আল-হামদানী। (ওফাত: রবিউল আওয়াল, ৪১৬হি.)
এ ছাড়াও প্রায় শতাধিক যুগশ্রেষ্ঠ আলেমের তিনি শিষ্য।
◾ ছাত্রবৃন্দ:
তিনি তাঁর অসংখ্য রচনাবলীর পাশাপাশি গর্ব করার যোগ্য অসংখ্য শিষ্যও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উপহার দিয়ে গেছেন, যাঁরা তাঁর জ্ঞানের গভীর সাগর থেকে মুক্তা আহরণ করে মুসলিম সমাজে বিতরণ করেছেন অকাতরে। তাঁদের মধ্যে:
১. ইমাম আবূ আবদিল্লাহ্ আন্ নিশাপূরী আশ-শাফে‘ঈ (ওফাত: ৫৩০হি.), তিনি ইমাম বায়হাক্বীর অন্যতম শিষ্য এবং তাঁর কিতাব ‘দালা-ইলুন্ নুবূওয়ত’ ‘আদ্ দাওয়াত আল কাবীর’ ও ‘আল বা’স’-এর গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী।
২. ইমাম আবুল মা‘আ’লী মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল ফারেসী সুম্মা আন্- নিশাপুরী। তিনিও ছিলেন ইমাম বায়হাক্বীর শিষ্যদের একজন। তিনি তাঁর থেকে ‘সুনানে কুবরা’ শ্রবণ করেন, তিনি ছিলেন যুগের একজন প্রসিদ্ধ সেক্বাহ্ মুহাদ্দিস। তাঁর থেকে ইমাম ইবনুল আসাকির শেখ আবূ সা‘ঈদ আস- সাম‘আনীসহ অনেক প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাদীস বর্ণনা করেন।
◾ রচনাবলী:
ইমাম বায়হাক্বী বাল্যকাল থেকেই ছিলেন জ্ঞান পিপাসু ও কঠোর পরিশ্রমী। জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্যে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল চষে বেড়ানোর পাশাপাশি তাঁর প্রখর মেধা ও ধী-শক্তি তাঁকে বিশ্ববরেণ্য লেখকদের প্রথম সারিতে অবস্থান করে নিতে সাহায্য করেছে। তাঁর রেখে যাওয়া বিভিন্ন ভলিয়মের সহস্রাধিক গ্রন্থ পুস্তক ভান্ডার আজ বিশ্ব মুসলমানের জন্য অমূল্য সম্পদ ও গ্রন্থাগারগুলোর গৌরবের উপাদান। তিনি তাঁর গবেষণামূলক ক্ষুরধার লেখনীর বিরাট সংখ্যক পুস্তক রচনা করে চিরকালের জন্য বিশ্ব মুসলিমকে ঋণী করে রেখেছেন।
◾ নিম্নে তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলঃ
১. ( السنن الكبرى ) ‘আস-সুনান আল-কুবরা’। এটা ইমাম বায়হাক্বীর সর্ব বৃহদাকারের গ্রন্থাবলীর অন্যতম, যা হাদীস শরীফের কিতাবগুরোর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে রেখেছে। বিশ্ববিখ্যাত অনেক মুহাদ্দিস এ গ্রন্থটি নিজেও শ্রবণ করেছেন এবং অন্যদেরকেও পাঠ করে শুনিয়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিসগণ এ কিতাবটির ভ‚য়সী প্রশংসা করেছেন। ইমাম ইবনুস্ সালাহ্ (ইন্তেক্বাল: ৬৪৩হি.) কিতাবটিকে হাদীস শাস্ত্রে লিখিত কিতাবগুলোর ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ স্থানে রেখেছেন। এমনকি ‘সুনানে ইবনে মাজাহ্’-এর উপরে স্থান দিয়েছেন। যেমন-
১. বোখারী, ২. মুসলিম, ৩. আবূ দাঊদ, ৪. তিরমিযী ও ৫. নাসা‘ঈ শরীফ এরপর ‘সুনানে কুবরা’-এর স্থান।
ইমাম সুবকী (ওফাত: ৭৭১হি.) এ কিতাবের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন,
أمّا السنَنَ الكُبرى فَمَا صَنَف في علم الْحَدِيث مثله تهدِنَا وَتَرْتِيَا وَجَوَدَةً
অর্থাৎ হাদীস শাস্ত্রে, ঐতিহ্যগত, বিন্যাসগত ও মানগত দিক দিয়ে ‘সুনানে কুবরা’র মতো কিতাব প্রণয়ন করা হয়নি। মোটকথা, বিন্যাস, ধারাবাহিকতা ও গুণগতমানের দিক থেকে ইমাম বায়হাক্বীর ‘সুনানে কুবরা’ হাদীস শাস্ত্রে এক অতুলনীয় কিতাব। কিতাবটি ১০ (দশ) খন্ড সম্বলিত।
২. السنن والاثار (আস্সুনান ওয়াল আ-সা-র)। কিতাবটি ৪ (চার) খন্ডবিশিষ্ট।
৩. الاسماء والصفات (আল-আসমা ওয়াস্ সিফাত)। এটা ২ (দুই) খন্ড বিশিষ্ট।
৪. المعتقد (আল-মু’তাক্বাদ)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
৫. البعث (আল-বা’স)। এটা ১ (এক) খণ্ডে প্রণীত।
৬. الترغیب والترھیب (আত-তারগীব ওয়াত্ তারহীব)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
৭. الدعوات (আদ্দা’ওয়াত)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
৮. الزھد (আয্ যুহ্দ)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
৯. الخلافیات (আল-খিলা-ফিয়াত)। এটা ৩ (তিন) খণ্ডে লিখিত।
১০. نصوص الشافعى (নুসূসুশ্ শাফে‘ঈ)। এটা ২ (দুই) খণ্ডে লিখিত।
১১. دلائل النبوة (দালা-ইলুন নুবূয়ত)। এটা ৪ (চার) খণ্ডে লিখিত।
১২. السنن الصغیر (আস্ সুনানুস্ সগীর)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
১৩. شعب الایمان ( শু’আবুল ঈমান)। এটা ২ (দুই) খণ্ড বিশিষ্ট।
১৪. المدخل الى السنن (আল্-মাদ্খাল ইলাস্ সুনান)। এটা ১ (এক) খণ্ডবিশিষ্ট।
১৫. (আল-আদাব): এটা ১ (এক) খণ্ড বিশিষ্ট ) الاداب।
১৬. حَیاَةُ الأنَْبِیآَ ِء عَلیَْھِمُ َّ السلامَُ ِفىْ قبُوُْرِ ِھمْ (ফাদ্বা-ইলুল আওক্বাত)। এটা (দুই) খণ্ড সম্বলিত فضائل الاوقات .
১৭. الاربعین الاربعین الصغیرالكبیر (আল আরবা‘ঈনুল কবীর)। এটা ২ (দুই খন্ডে)।
১৮. এটা ১ (এক)) খণ্ডের কিতাব খণ্ডবিশিষ্ট
لِلْإِمَامِ الْبَیْھَقِ ِّ ى رَحِمَھُ ﷲُ تَعَالى (আল-আরবা‘ঈনুস্ সগীর)
১৯. الرؤیة ( আর রু’ইয়াহ্)। এটা ১ (এক) খণ্ডবিশিষ্ট।
২০. الاسراء (আল-ইসরা)। এটা ১ (এক) খণ্ড সম্বলিত।
২১. مناقب الشافعى ( মানাক্বিবুশ্ শাফে‘ঈ। ১ (এক) খণ্ড বিশিষ্ট।
২২. مناقب احمد ( মানাক্বিবে আহমদ)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
২৩. فضائل الصحابة ( ফাদ্বা-ইলুস্ সাহাবা)। এটা (এক) খণ্ড বিশিষ্ট।
২৪. احادیث الشافعى (আহা-দী-সুশ্ শাফে‘ঈ)। এটা ১ (এক) খণ্ড বিশিষ্ট।
২৫. ألف مسألة (আলফু মাস্আলাহ্)। এটা ১ (এক) খণ্ডে লিখিত।
২৬. بیان خطأ من أخطأ على الشافعى (বয়ানু খাত্বাই মান্ আখত্বাআ আলাশশাফে‘ঈ)। এটা ১ (এক) খণ্ড বিশিষ্ট।
২৭. (তাখরীজু আহা-দী-সিল উম্ম্)
تخریج احادیث الام (كتاب الام للشافعى)
(কিতাবুল উম্ম, ইমাম শাফে‘ঈ কৃত)। এটা ১ (এক) খণ্ড বিশিষ্ট।
২৮. معالم السنن (মা‘আ-লিমুস্ সুনান),
العقائد (আল-আক্বাইদ),
اثبات عذاب القبر (ইসবাতু আযাবিল কবর),
القراءة خلف الامام (আল-কিরাআতু খালফাল ইমাম),
২৯.( الاعتقاد والھدایة الى سبیل الرشاد (আল-কাদ্বা ওয়াল ক্বদর) القضاء والقدر .(ই’তিক্বাদু ওয়াল হিদায়াতু ইলা সাবীলির রাশাদ) الایمان (আল-ঈমান)
৩০. .احكام القران (আহকামুল করআন),حیاة الانبیاء فى قبورھم بعد وفاتھم, (হায়াতুল আম্বিয়া) ইত্যাদি।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন