প্রথম অধ্যায়ঃ ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) প্রসঙ্গ
ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) পবিত্র কুরআনের আলোকেঃ
মহান আল্লাহ তা‘য়ালা নিয়ামাত প্রাপ্তির পর তার শোকরিয়া আদায়ের জন্য মহান রব কুরআনে বহুবার তাগিদ দিয়েছেন। আর আল্লাহর বড় অনুগ্রহ বা নিয়ামত হলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। তাই রাসূল (ﷺ) কে পেয়ে খুশি, আনন্দ, উল্লাস উদ্যাপন করা মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নির্দেশ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ🔺(يونس-٥٨)…
হে হাবিব! আপনি বলে দিন আল্লাহর অনুগ্রহ (ইলম) ও তার রহমত (রহমাতুল্লিল আলামিন) প্রাপ্তিতে তাদের (মু‘মিনদের) খুশি (ঈদ) উদযান করা উচিত এবং আর সেটা হবে তাদের জমাকৃত ধন সম্পদ অপেক্ষা শ্রেয়।’’
🔺(সুরা ইউনুস-৫৮)..
এ আয়াতে আল্লাহর (ফদ্বল) অনুগ্রহ এবং আল্লাহর রহমত (রহমাতাল্লিল আলামিন) পাওয়ার পরে মুমিনদের খুশি মানে ঈদ উদযাপন করার নির্দেশ মহান আল্লাহর। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাফসিরকারক ও হাফিজুল হাদিস ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতি (رحمة الله) 🔺(ওফাত. ৯১১হি.) লিখেন-
وَأخرج أَبُو الشَّيْخ عَن ابْن عَبَّاس رَضِي الله عَنْهُمَا فِي الْآيَة قَالَ: فضل الله الْعلم وَرَحمته مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ الله تَعَالَى وَمَا أَرْسَلْنَاك إِلَّا رَحْمَة للْعَالمين.
(১০৭ الْأَنْبِيَاء الْآيَة )
-‘‘ইমাম আবু শায়খ ইস্পাহানী (رحمة الله) তার তাফসীরে উল্লেখ করেন, সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে আল্লাহর (ফাদ্বল) বা অনুগ্রহ দ্বারা ইলম বা জ্ঞানকে এবং (রহমত) দ্বারা নবীজী (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- হে হাবিব আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ব-জগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্ররেণ করেছি।
(সুরা আম্বিয়া, আয়াত নং-১০৭)।’’
🔺(ইমাম তিরমিযী-মাজমাউল বায়ান,৫/১৭৭-১৭৮পৃ)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাস্সির ইমাম সৈয়দ শিহাবুদ্দীন মাহমুদ আলূসী বাগদাদী (رحمة الله) 🔺(ওফাত. ১২৭০হি.) স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেন-
وأخرج أبو الشيخ عن ابن عباس رضي الله تعالى عنهما أن الفضل العلم والرحمة محمد صلّى الله عليه وسلم.
“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন নিশ্চয়ই (ফাদ্বলুল্লাহ্) বা অনুগ্রহ হল ইলমে দ্বীন এবং রহমত হলো নবী করিম (ﷺ)।’’
🔺(আল্লাম শিহাব উদ্দিন সৈয়দ মাহদুদ আলুসী-রুহুল মা'আনী,৬/১৩৩পৃ)
ইমাম সৈয়দ মাহমুদ আলূসী (رحمة الله) আরও উল্লেখ করেন-
وأخرج الخطيب، وابن عساكر عنه تفسير الفضل بالنبي عليه الصلاة والسلام.
-‘‘হযরত খতিবে বাগদাদী (رحمة الله) এবং ইমাম ইবনে আসাকীর (رحمة الله) সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন, ফাদ্বল (অনুগ্রহ) দ্বারাও নবী করীম (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে।”
🔺(আল্লামা শিহাব উদ্দিন মাহমুদ আলুসী-রুহুল মা'আনী,৬/১৩৩পৃ)
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! সাহাবীদের তাফসীর হল মারফূ হাদিসের ন্যায়। ইমাম হাকেম নিশাপুরী (ওফাত. ৪০৫হি.) বলেন-
وَتَفْسِيرُ الصَّحَابِيِّ عِنْدَهُمَا مُسْنَدٌ -
‘‘ইমাম বুখারী মুসলিমের নিকট সাহাবীদের তাফসীর মারফূ হাদিসের ন্যায়।’’
🔺(ইমাম হাকেম নিশাপুরী : আল-মুস্তাদরাক : ১/২১১পৃ. কিতাবুল ইলম, হাদিস নং-৪২২, দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ. ১৪১১হি.)
ইমাম নববী আশ্-শাফেয়ী (ওফাত. ৬৭৬হি.) বলেন-
وَأَمَّا قَوْلُ مَنْ قَالَ: تَفْسِيرُ الصَّحَابِيِّ مَرْفُوعٌ -
‘‘সাহাবীদের কোরআনের কোন ব্যাখ্যা মারফূ হাদিসের ন্যায়।’’
🔺(ইমাম নববী : আল-তাক্বরীব ওয়াল তাইসীর : ৩৪পৃ. দারুল কিতাব আরাবী, বয়রুত, লেবানন, প্রথম প্রকাশ. ১৪০৫হি.)
বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত কাতাদা (رضي الله عنه) ও তাবেয়ী ইমাম মুজাহিদ (رحمة الله) সহ আর ও অনেকে বর্ণনা করেন যে আহলে বায়াতের অন্যতম সদস্য হযরত ইমাম আবু জাফর বাকের (رضي الله عنه) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
عن قتادة رضى الله تعالى عنه ومجاهد وغيرهما قال ابو جعفر الباقر عليه السلام فضل الله رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم .
-“আল্লাহর (ফদ্বল) বা অনুগ্রহ দ্বারা ও রাসূল (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে।”
🔺(ইমাম তিবরিসী, মাজমাউল বায়ান ৪/১৭৭-১৭৮ পৃ.।)
শুধু তাই নয় উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম হাইয়্যান আন্দুলুসী (رحمة الله) 🔺(ওফাত. ৭৪৫হি.) বর্ণনা করেন-
وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فِيمَا رَوَى الضَّحَّاكُ عَنْهُ: الْفَضْلُ الْعِلْمُ وَالرَّحْمَةُ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
“তাবেয়ী ইমাম দাহ্হাক (رحمة الله) সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন- উক্ত আয়াতে (ফদ্বল) দ্বারা ইলমকে এবং (রহমত) দ্বারা মুহাম্মদ (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে।”
🔺(ইমাম হাইয়্যান, তাফসীরে বাহারুল মুহিত, ৫/১৭১ পৃ.)
বিশ্ব-বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও তাফসিরকারক ইমাম যওজী (رحمة الله) 🔺(ওফাত.৫৯৭হি.) উক্ত আয়াতে সম্পর্কে লিখেন-
ফাদ্বল দ্বারা ইলম বা জ্ঞানকে এবং রহমত দ্বারা মুহাম্মদ (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে যেমনটি তাবেয়ী ইমাম দাহ্হাক (رحمة الله) তাঁর শায়খ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেছেন।”
🔺(ইমাম যওজী, যা’দুল মাসীর ফি উলূমূত তাফাসীর, ৪/৪০ পৃ.)
উক্ত আয়াতের রহমত এবং (فضل الله) ফাদ্বলুল্লাহ দ্বারাও রাসূল (ﷺ) কে বুঝানো হয়েছে বলে সাহাবী এবং তাবেয়ীদের তাফসীর দ্বারা প্রমাণ পাওয়া গেল। সুতরাং আলোচ্য আয়াত ও তাঁর তাফসীরের মাধ্যমে বুঝা গেল, মিলাদুন্নবী (ﷺ) বা রাসূল (ﷺ) এর দুনিয়ায় শুভাগমনের কারণে আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে আনন্দ উৎসব বা খুশি উদ্যাপন করার নির্দেশ দিয়েছে তার নামই হল ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ)।
মহান রব ইরশাদ করেন-
‘‘যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফুরী বশতঃ পরিবর্তন করেছে।’’
🔺(সূরা ইব্রাহিম, আয়াত নং- ২৮)
রাসূল (ﷺ) কে আল্লাহ এ আয়াতে নিয়ামত বলেছেন; আর নিয়ামতকে অস্বীকার করেছেন কারা সে সম্পর্কে ইমাম বুখারী (رحمة الله) উল্লেখ করেছেন- هم كفار أهل مكة -‘‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন, যারা আল্লাহর নেয়ামত (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে) কুফুরী বশতঃ পরিবর্তন করেছে তারা হলেন মক্কার কুরাইশ গোত্রের কাফের গণ।’’
🔺(বুখারী, আস্-সহিহ, ৬/৮০পৃ. হাদিস নং. ৪৭০০)
সুতরাং যারা কুরআনে ঘোষিত হওয়ার পরও রাসূল (ﷺ) কে আল্লাহর রহমত বা অনুগ্রহ স্বীকার করতে চান না, তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! রাসূল (ﷺ) এর দুনিয়ায় আগমনের কারণে ঈদ বা আনন্দ উৎসব করার দলীল উপরের আয়াতে কারিমাগুলোতে আমরা ইতোমধ্যে পেলাম। আর ঈমানদারের জন্য এতটুকু এই দলিলই যথেষ্ট।
++++++++++
ফতোওয়ায়ে আহলে সুন্নাহ (আটটি বিষয়ের সমাধান)
গ্রন্থনা ও সংকলনেঃ
মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর
প্রতিষ্ঠাতা, ইমাম আযম রিসার্চ সেন্টার, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ ০১৭২৩-৯৩৩৩৯৬
সম্পাদনা পরিষদঃ
আল্লামা মুফতি আলাউদ্দিন জিহাদী (মা.জি.আ.)
মুনাজেরে আহলে সুন্নাহ ও বিশিষ্ট ইসলামী লেখক ও গবেষক।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন