জা’আল হক (প্রথমাংশ)


দ্বিতীয় অধ্যায়
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হুযুর পুর নুর (ﷺ) এর মানব হওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে উত্থাপিত আপত্তি সমূহের বিবরণ
-------------
হুজুর (ﷺ) এর ‘আবদিয়তের’ ফলশ্রুতিতে মহান আল্লাহর শান প্রকাশ পায় আর মহান প্রতিপালকের মহত্বের ফলে আমাদের ‘আবদিয়ত’ প্রতিভাত হয়েছে। উজীর ও সিপাহী-উভয়ই রাজ কর্মচারী বটে, কিন্তু উযীরের দ্বারা বাদশাহ এর শান প্রকাশ পায়, আর সিপাহীর মান-সম্মান হচ্ছে রাজকীয় চাকুরী লাভের ভিত্তিতে।


৬নং আপত্তিঃ ‘শামায়েলে তিরমীযীতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) এর একটি রিওয়ায়েত আছে, যেখানে তিনি  হুজুর (ﷺ) প্রসঙ্গে বলেছেনঃ كَانَ بَشَرٌُ مِّنَ الْبَشَرِ অর্থাৎ- তিনি ছিলেন মানুষদের মধ্যে একজন মানুষ (বশর)। এরূপ,  হুজুর (ﷺ) যখন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) কে স্ত্রী হিসেবে বরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন সিদ্দীক আকবর  (رضي الله عنه) বলেছিলেন- আমি আপনার ভাই, আমার মেয়ে কি আপনার জন্য হালাল হবে? দেখুন, হযরত আয়েশা  (رضي الله عنه) হুযুরকে ‘বশর’ বলেছেন, আর হযরত সিদ্দীক আকবর  (رضي الله عنه) বলেছেন তাঁকে নিজের ভাই।


উত্তরঃ মানুষ বা ভাই বলে নবীকে আহবান করা বা প্রচলিত ব্যবহারিক রীতি অনুযায়ী মানুষ বা ভাই বলে অভিহিত করা হারাম; তবে আকীদা বর্ণনা ও মাসায়েল জিজ্ঞাসা করার হুকুম ভিন্ন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) বা হযরত সিদ্দীক আকবর  (رضي الله عنه) কথাবার্তা বলার সময় হুযুরকে (ﷺ) ভাই বা মানুষ বলে অভিহিত করতেন না। এখানে সে শব্দটি ব্যবহার করেছেন বিশেষ প্রয়োজনে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) বলেছিলেন,  হুজুর (ﷺ) এর পবিত্র জীবন সাধারণ মুসলমানদের মত কৃত্রিমতা বিবর্জিত, সাদা-সিধে অতিবাহিত হয়েছে, প্রতিটি কাজ তিনি নিজ হাতে সম্পন্ন করতেন। অনুরূপ হযরত সিদ্দীক আকবর  (رضي الله عنه) জানতে চেয়েছিলেন এ মাসআলাটি যে, হুযুর তো আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেছেন, এ সম্বোধনের ফলশ্রুতি স্বরূপ সহোদর ভাই এর হুকুম আমার উপর বর্তাবে কিনা? এবং আমার কন্যাগণ হুযুরের জন্য বৈধ হবে কিনা? আকীদাহ বর্ণনার সময় আমরাও বলি যে, নবী মানুষ। হযরত ইবরাহিমখলীল (আলাইহিস সালাম) বিশেষ এক প্রয়োজনে স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাহ সম্পর্কে বরেছিলেন- ইনি আমার বোন; অথচ বিবি সারাহ ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাই এরূপ কথা থেকে অবশ্যম্ভাবীরূপে একথা বোঝা যায় না, হযরত সারাহ তাঁকে ভাই বলে ডাকতেন।


এবার উনাদের সাধারণ প্রচলিত ভাষার ব্যবহারিক দিক তুলে ধরছি। একথা সর্বজন বিদিত যে, আত্মীয়তার দিক থেকে  হুজুর (ﷺ) হচ্ছেন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) এর স্বামী, সাইয়িদুনা হযরত আলী  (رضي الله عنه) এর ভাই এবং হযরত আব্বাস  (رضي الله عنه) এর ভ্রাতুষ্পুত্র। কিন্তু যখনই তাঁরা হাদীছ রিওয়ায়াত করতেন, তখন হযরত সিদ্দীকা  (رضي الله عنه) এরূপ বলতেন না, ‘আমার স্বামী বলেছেন’, হযরত আব্বাস  (رضي الله عنه) বা হযরত আলী  (رضي الله عنه) বলতেন না- ‘আমার ভাইপো বা আমার ভাই ইরশাদ করেছেন।


❏সবাই বলতেন-


قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ


[রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন।] সুতরাং, যাঁরা আত্মীয়তার দিক থেকে ভাই হয়েও তাঁকে ভাই বলতেন না, এমতাবস্থায়, আমাদের মত নগণ্য গোলামদের কি অধিকার আছে তাঁকে ভাই বলার?


❏কবির ভাষায়ঃ


نسبت خود بسگت كردم وبس منفعلم

زانكه نسبت بسگت كوئى تو شدبے ادبے است

هزار بار بشو يم دهن بمشك وگلاب

هنوزنام تو گفبن كمال بے ادبى است


অর্থাৎ- হে আল্লাহর রাসূল! আমি নিজেকে আপনার কুকুরের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি। আপনার কৃপা লাভের জন্য এরূপ সম্পৃক্ততা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নতুবা আপনার গলির কুকুরের সাথে আমার মত নগণ্য ব্যক্তিকে সম্পর্কযুক্ত করাও বে-আদবীর শামিল। আমার এ অপবিত্র মুখকে হাজার বার জল ও মেশক দ্বারা ধুয়েও আপনার মুবারক নাম উচ্চারণ করা পুরাপুরিই বে-আদবী।


জনাব, ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে এ বিধান ছিল যে, কেউ যদি কোন বিষয়ে  হুজুর (ﷺ) এর সমীপে কিছু আরয করতে চাইতেন, তখন তাঁকে কিছু দান করেই আরয করতে হত।


❏এ প্রসঙ্গে কুরআন ইরশাদ করেছেঃ


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً


-‘‘ওহে মুমিনগণ, যখন তোমরা রাসূলের কাছে চুপে চুপে কোন কথা আরয করতে চাও, তখন আরয করার আগেই কিছু সদকা কর।’’

সাইয়িদুনা হযরত আলী  (رضي الله عنه) এ নিয়ম পালন করেছিলেন।

(তাফসীরে খাযেনে’ সে একই আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)।


এ বিধান পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে বটে, তবে, এতে  হুজুর (ﷺ) এর মান-মর্যাদার মাহাত্ম্যই ফুটে উঠেছে। নামাযে মহা প্রতিপালকের সাথে কথা বলার জন্য কেবল ওযু করলেই হয়, আর হুযুর সমীপে কিছু আরয করতে চাইলে সদকা করতে হয়। এমতাবস্থায় তাঁকে ভাই বলার অবকাশ রইল কোথায়?

++++++++++++
জা’আল হক (প্রথমাংশ)

মূলঃ হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহে আলাইহে

অনুবাদকঃ (শাহজাদা) মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আলম ও মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।

তথ্য সংযােজনঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন