জা’আল হক (প্রথমাংশ)


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

(অদৃশ্য বিষয়াদির জ্ঞানের অস্বীকৃতিসূচক হাদীছসমূহের বর্ণনা)
-----------------

ভিন্নমতাবলম্বীগণ অদৃশ্য জ্ঞানের অস্বীকৃতির সমর্থনে অনেক হাদীছ উপস্থাপন করে থাকেন। সে সমস্ত দলীলের সার্বিক মোটামুটি উত্তর হলো, সেই হাদীছসমূহে  রাসূল (ﷺ) কোথাও একথা বলেন নি যে, আল্লাহ তা’আলা আমাকে অমুক বিষয়ের জ্ঞান দান করেন নি। বরং,


❏ কোন হাদীছে আছে اَللهُ اَعْلَمُ (আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত), কোন জায়গায় আছে- ‘আমি কি জানি?’


❏ কোন জায়গায় উল্লেখিত আছে- ‘অমুক বিষয় সম্পর্কে  রাসূল (ﷺ) কিছুই বলেন নি,


❏ আবার কোন জায়গায় আছে- ‘ রাসূল (ﷺ) অমুক ব্যক্তির নিকট একথাটি জিজ্ঞাসা করেছিলেন।


এসব উক্তি থেকে ইলমে গায়েবের অস্বীকৃতি প্রকাশ পায় না। কোন কথা না বলা বা কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা বা ‘আল্লাহই অধিক জ্ঞাত’ বলার মধ্যে অনেক কল্যাণময় উদ্দেশ্য নিহিত থাকতে পারে। এমন অনেক বিষয় আছে, যা আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের কাছে ব্যক্ত করেন নি, এমনকি প্রশ্ন করার পরেও সরাসরি উত্তর না দিয়ে গোপন রেখেছেন। আবার অনেক বিষয় সম্পর্কে বিশ্বপ্রতিপালক ফিরিশতাদেরকেও জিজ্ঞাসা করেন। তাহলে কি আল্লাহরও জ্ঞান নেই? দেখি, এমন একটি অকাট্যের মর্যাদাপ্রাপ্ত সহীহ হাদীছ উপস্থাপন করুন, যেখানে ইলমে গায়ব প্রদান করার বিষয়টির অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, তারা কখনও উপস্থাপন করতে পারবেন না। এতটুকু উত্তরই যথেষ্ট ছিল। তবুও তাদের উল্লেখিত ‘মশহুর’ হাদীছসমূহ উল্লেখপূর্বক পৃথক পৃথকভাবে উত্তর প্রদানে প্রয়াস পাচ্ছি। وَبِا للهِ التَّوْفِيْقِ (আল্লাহর কাছে এর তওফীক প্রার্থনা করছি।

বিঃ দ্রঃ যে হাদীছ তাবেয়ী এবং তৎপরবর্তী অসংখ্য বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, যাঁদের সংখ্যাধিক্যের বিচার করলে উক্ত হাদীছের বিশুদ্ধতা সুনিশ্চিত হয় এবং তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না, এ ধরনের হাদীছকে ‘হাদীছে মশহুর’ বলা হয়।


১নং আপত্তিঃ


❏ ‘মিশকাত শরীফের’ ইলানুন নিকাহ اعلان النكاح অধ্যায়ের প্রথম হাদীছে হযরত রুবীয়া (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত আছে,  রাসূল (ﷺ) কোন এক বিবাহ অনুষ্ঠানে তাশরীফ নিয়েছিলেন, তথায় আনসারের কিশোরীগণ দফ বাজিয়ে বদর যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিবর্গের শোকগাঁথার গান গাচ্ছিল। তাদের মধ্যে কেউ এ পংক্তিটিও আবৃত্তি করেঃ


وَفِيْنَا نَبِىٌُّ يَعْلَمُ مَا فِىْ غَدٍ


-‘‘আমাদের মধ্যে এমন এক নবীও আছেন, যিনি আগামীকাল কি হবে, তা’ও জানেন।

তখন  রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেন- ‘একথা বাদ দাও, ওটাই গাইতে থাক, যা প্রথমে গাচ্ছিলে’। 

{ক. খতিব তিবরিযীঃ মেশকাতঃ ২/৫৭৭ পৃ. হাদিসঃ ৩১৪০

খ. তিরমিজীঃ আস-সুনানঃ ৩/৩৯৯ হাদিসঃ ১০৯০

গ. ইবনে মাজাহঃ আস-সুনানঃ কিতাবুন-নিকাহঃ ১/৬১১ হাদিসঃ ১৮৯৭

ঘ. ইবনে হিব্বানঃ আস-সহীহঃ ১৩/১৮৯ পৃ. হাদিসঃ ৫৮৭৮

ঙ. আবু দাউদঃ আস-সুনানঃ ৪/২৮১ হাদিসঃ ৪৯২২

চ. ইমাম নাসায়ীঃ সুনানে কোবরাঃ ৩/৩৩২ হাদিসঃ ৫৫৬৩

ছ. ইমাম বুখারীঃ আস-সহীহঃ ৯/২০২ পৃ. হাদিসঃ ৫১৪৭}


এ হাদীছ থেকে বোঝা গেল যে,  রাসূল (ﷺ)-এর ইলমে গায়ব ছিল না। যদি থাকতো তাহলে ওই মেয়েদের সে কথা বলার সময় বাঁধা দিতেন না। সত্যি কথা বলতে বাধা দিলেন কেন?


উত্তরঃ


প্রথমতঃ চিন্তা করা দরকার যে, এ পংক্তিটি সে সব মেয়েরা নিজেরাই রচনা করেনি। কেননা ওই কন্যাদের পক্ষে কবিতা রচনা সম্ভব পর নয়। আর কোন কাফির বা মুশরিকও সেটি রচনা করেনি। কেননা, ওরা তো  রাসূল (ﷺ)কে নবী হিসেবে মানতো না। তাই নিঃসন্দেহে এটি কোন সাহাবীর রচিত কবিতারই পংক্তি হবে। এখন বলুন, ঐ কবিতা রচয়িতা সাহাবী (মা’আযাল­) মুশরিক কিনা? আর রাসূল (ﷺ) উক্ত কবিতা রচয়িতাকে মন্দও বলেন নি, কিংবা কবিতারও বিরূপ কোন সমালোচনা করেন নি। ওটা গাইতে বারণ করেছেন মাত্র। প্রশ্ন হলো, কেন বারণ করলেন? এর পেছনে চারটি কারণ রয়েছে।


প্রথমতঃ কেউ যদি আমাদের সামনে আমাদের প্রশংসা করে, তখন বিনয়াবনত কণ্ঠে আমরা বলি “আরে মিঞা! এ সব কথা বাদ দিন, অন্য কথা বলুন”। এখানেও রাসূল (ﷺ) বিনয় প্রকাশার্থে উপরোক্ত উক্তি করেছেন।


দ্বিতীয়তঃ হাস্য-কৌতুক ও গান-বাজনার পরিবেশের মধ্যে নাত’বা তাঁর প্রশংসাসূচক কবিতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন। ‘নাত’ পাঠ এর জন্য আদব ও ভক্তির প্রয়োজন।


তৃতীয়তঃ গায়বকে তার নিজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্বন্ধিত করাটাই তার পছন্দ হয়নি।

চতুর্থতঃ আজকাল যেমন ‘নাত’ আবৃত্তিকারীগণ ‘নাত’ ও শোকগীতি এক সাথে মিলিয়ে পাঠ করে, সেরূপ শোকগীতির মধ্যখানে নাত পড়াটাই তাঁর অপছন্দ ছিল।


❏ মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘মিরকাতে’ উক্ত হাদীছ প্রসঙ্গে লিখা হয়েছেঃ


لِكَرَاهَةِ نِسْبَةِ عِلْمِ الْغَيْبِ إِلَيْهِ لِأَنَّهُ لَا يَعْلَمُ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَإِنَّمَا يَعْلَمُ الرَّسُولُ مِنَ الْغَيْبِ مَا أُخْبِرَهُ أَوْ لِكَرَاهَةِ أَنْ يَذْكُرَ فِي أَثْنَاءِ ضَرْبِ الدُّفِّ وَأَثْنَاءِ مَرْثِيَّةِ الْقَتْلَى لِعُلُوِّ مَنْصِبِهِ عَنْ ذَلِكَ


-‘‘তার নিজের সত্ত্বার প্রতি ইলমে গায়বকে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত করাতে রাসূল (ﷺ) তা নিষেধ করেছিলেন। কেননা অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে খোদা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না; রাসূল জানেন সে সমস্ত অদৃশ্য বিষয় বা বস্তু, যা আল্লাহ অবহিত করেন। বা দফ বাজিয়ে অথবা নিহত ব্যক্তিবর্গের শোক গাঁথা গেয়ে তাঁর প্রশংসা করাটাই তাঁর অপছন্দ ছিল। কেননা, তাঁর মান মর্যাদা সে পরিবেশে প্রশংসিত হওয়ার সম্মানের চাইতে আরো অনেক বেশী।’’

{আল্লামা মোল­ আলী ক্বারীঃ মেরকাতঃ ৬/২১০ পৃ.}



❏ ‘আশিয়াতুল লুম’আত’ গ্রন্থে এ হাদীছের ব্যাখ্যায় উল্লেখিত আছে-


گفته اند كه منع آنحضرت ازيں قول بجهت آست كه دروے اسناد علم غيب است به آنحضرت را ناخوش آمد وبعضے گوئيند كه بجهت آں است كه ذكر شريف وے در اثنا لهو منا سب نه


 باشر অর্থাৎ ভাষ্যকারগণ বলেন,  রাসূল (ﷺ) ওটাকে এ জন্যই নিষেধ করেছেন যে, উক্ত পংক্তিতে ইলমে গায়বকে সরাসরি হুযুরের সহিত সম্বন্ধিত করা হয়েছে। সুতরাং, এটা তাঁর পছন্দ হয়নি। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, হাস্য কৌতুকের পরিবেশে রাসূল (ﷺ) প্রশংসা সূচক উল্লেখ সমীচীন নয়।

{শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীঃ আশিয়াতুল লুমআতঃ ৩/১১৭ পৃ.}




২নং আপত্তিঃ


মদীনা শরীফে আনসারের লোকেরা বাগানের মদ্দা খেজুর গাছের শাখা-প্রশাখা মাদ্দী গাছের সঙ্গে লাগিয়ে দিতেন, যাতে ফলন বেশী হয়।  রাসূল (ﷺ) তাঁদেরকে এ কাজ করতে বারণ করেছিলেন। (এ কাজকে আরবীতে ‘তালকীহ’ تلقيخ বলা হয়।) তখন তাঁরা এ পদ্ধতি (তালকীহ) ছেড়ে দিলেন। খোদার কি শান! ফলন কম হলো। এর অভিযোগ তাঁর সমীপে পেশ করা হলে, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ


اَنْتَمْ اَعْلَمُ بِاُمُوْرِ دُنْيَا كُمْ


অর্থাৎ- তোমাদের পার্থিব বিষয়াবলীতে তোমরাই অধিক জ্ঞাত।

{ক. খতিব তিবরিযীঃ মেশকাতঃ ১/৫০ পৃ. হাদিসঃ ১৪৭

 খ. মুসলিমঃ আস-সহীহঃ ৪/১৩৫ঃ হাদিসঃ ২৩৬২

 গ. মুসলিমঃ আস-সহীহঃ ২/২৬৪ পৃ. হাদিসঃ ১৪০}


বোঝা গেল ‘তালকীহ’ করা থেকে বিরত রাখলে যে ফসল কম হবে, সে জ্ঞান তার (ﷺ) ছিল না। অধিকন্তু আনসারদের জ্ঞান যে তাঁর থেকে বেশী, তাই প্রমাণিত হলো।

উত্তরঃ  রাসূল (ﷺ) কর্তৃক ‘তোমাদের পার্থিব কাজকর্মে তোমরা অধিক জ্ঞাত’ একথা বলার মধ্যে বিরক্তি বা অসন্তোষই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, যখন তোমরা ধৈর্যধারণ করছ না, তোমরাই তোমাদের ব্যাপারে ভাল জান। যেমন আমরা কাউকে কোন কথা বললে সে যখন এতে সাত পাঁচ চিন্তা করতে থাকে, তখন আমরা বলি, ভাই, তোমার ব্যাপার তুমিই জান। এরূপ উক্তির লক্ষ্যার্থ জ্ঞানের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন নয়।


❏ ‘শরহে শিফা’ মোল্লা আলী কারী (رحمة الله) ‘মু’জিযাত’ শীর্ষক বর্ণনায় লিখেছেনঃ


وَخَصَّهُ اللهُ مِنْ اَلاِطِّلاَعِ عَلَى جَمِيْعِ مَصَالِحِ الدُّنْيَا وَالدِّيْنِ وَاسْتُشْكِلَ بِاَنَّهُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ وَجَدَ الْاَ نْصَارَ يَلَقِّحُوْنَ النَّخْلَ فَقَالَ لَوْ تَرَكْتُمُوْهُ فَتَرَ كُوْهُ فَلَمْ يَخْرُجْ شَيْئًا – اَوْخَرَجَ شَيْصًا فَقَالَ اَنْتُمْ اَعْلَمُ بِاُمُوْرِ دُنْيَاكُمْ قَالَ الشَّيْخُ السِنَّوْسِيُّ اَرَادَ اَنْ يَحْمِلَهُمْ عَلَى خَرْقِ الْعَوَ ائِدِ فِىْ ذَالِكَ اِلَى بَابِ التَّوَكُّلِ وَاَمَّا هُنَا كَ فَلَمْ يَمْتَثِلُوْ فَقَالَ اَنْتُمْ اَعْرَفُ بِدُنْيَا كُمْ وَلَوِ اَمْتَثَلُوْا وَتَحَمًلُوْا فِىْ سَنَةٍ اَوْ سَنِيْنَ لَكُفُوْ اَمْرَ هَذِهِ الْمِحْنَةِ


অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা  রাসূল (ﷺ)কে দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণময় বিষয় সম্পর্কে অবহিত করার জন্য মনোনীত করেছে। এ নিয়ে এখন আপত্তি হচ্ছে যে, তিনি আনসারের লোকদের বৃক্ষরাজির তালকীহ করতে দেখে বলেছিলেন, এ অভ্যাস পরিত্যাগ করাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। তাই তাঁরা এ প্রথা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে কোন ফলন হলো না। বা ফলন কম হলো। তখনই তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) বলেছিলেনঃ তোমাদের দুনিয়াবী ব্যাপারে তোমরাই ভাল জান।’


❏ শাইখ সিন্নোসী (رحمة الله) বলেছেন, রাসূল (ﷺ) চেয়েছিলেন- তাঁদের চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীত কাজ করে তাদেরকে নির্ভরশীল তার তোরণদ্বারে পৌঁছিয়ে দিতে। কিন্তু তাঁরা ধৈর্যধারণ করলেন না। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরাই জান।’ যদি তাঁরা এটি মেনে নিতেন এবং দু’ এক বছর ক্ষতি স্বীকার করতেন, তাহলে এ অহেতুক পরিশ্রম থেকে রেহাই পেয়ে যেতেন।

{আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারীঃ শরহে শিফাঃ ৩/২২৩ পৃ.}



❏ আল্লামা মোল্লা আলী কারী (رحمة الله) একই ‘শরহে শিফার’ দ্বিতীয় খন্ডের ২৩৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ


وَلَوْ ثَبَتُوْا عَلَى كَلاَمِهِ لَفَاقُوْا فِى الْفَنِّ وَلاَرْتَفَعُ عَنْهُمْ كُلْفَةُ الْمَعَالَجَةِ


অর্থাৎ- যদি তাঁরা  রাসূল (ﷺ)-এর কথায় অবিচল থাকতেন, তাহলে সে বিষয়ে (ক্ষেতে উৎপাদনের) অনেক দূর এগিয়ে যেতেন এবং ‘তাঁদের এ ‘তলকীহ’ এর কষ্টও দূরীভূত হয়ে যেতো।


❏ সু-প্রসিদ্ধ فصل الخطاب কিতাবে আল্লামা কায়সারী (رحمة الله) এর বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করা হয়েছেঃ


وَلاَ يَعْذُبُ عَنْ عِلْمِهِ عَلَيْهِ السَّلاَمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِى الْاَرْضِ وَلاَفِى السَّمَاءِ مِنْ حَيْثُ مَرْتَبَتِهِ وَاِنْ كَانَ يَقُوْلُ اَنْتُمْ اَعْلَمُ بِامُوْرِ دُنْيَاكُمْ


অর্থাৎ- যমীন ও আসমানে পরমাণুসম কোন বস্তুও হুযুর (ﷺ) এর ব্যাপক জ্ঞানের পরিধি বহির্ভূত নয়। যদিও বা তিনি বলতেন দুনিয়াবী ব্যাপারে তোমরাই জান।


হযরত ইউসুফ (عليه السلام) কখনও কৃষি কাজ করেন নি, কৃষকদের সংশ্রবেও ছিলেন না। কিন্তু দুর্ভিক্ষের শিকার হওয়ার আগেই তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন বেশী করে গম চাষ করার জন্যে। আরও বলেছিলেনঃ


فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ


-‘‘যা কর্তন করবে, তা খোসা ছাড়ানো ছাড়াই রক্ষিত করে রাখবে।

{ সূরাঃ ইউসূফঃ আয়াতঃ ৪৭, পারাঃ ১২}


অর্থাৎ কৃষকদেরকেও গম সংরক্ষণের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। এখনও গমকে ভুষির মধ্যে রেখেই হিফাজন করা হয়। কৃষি কাজের এ গোপন বিষয় সম্পর্কে কিভাবে তিনি জ্ঞাত হলেন? তিনি বলেছিলেনঃ


اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ


-‘‘যমীনের ধনভান্ডারের দায়িত্বে আমাকে নিয়োজিত করুন, আমি এর হিফাজতকারী ও সংশি­ষ্ট প্রত্যেক কাজকর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত।’’ 

{সূরাঃ ইউসূফ, আয়াতঃ ৫৫, পারাঃ ১৩}



এ সমস্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও সংশি­ষ্ট বিষয়াদি কার থেকে শিখলেন তিনি?  রাসূল (ﷺ)-এর বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান কি হযরত ইউসুফ (عليه السلام) এর চেয়েও কম? (মায়াযাল্লা!)



৩নং আপত্তিঃ


❏ ‘তিরমিযী’ শরীফের কিতাবুত তাফসীর-এর সূরা আনআমে আছে, হযরত মাসরূক (رضي الله عنه) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি বলেন যে,  রাসূল (ﷺ) স্বীয় প্রভুকে দেখেছেন বা কোন কিছু গোপন করেছেন, তবে সে মিথ্যাবাদী। আরও বলেছেন-


وَمَنْ زَعَمَ أَنَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ، فَقَدْ أَعْظَمَ الفِرْيَةَ عَلَى اللَّهِ


অর্থাৎ- এবং যে কেউ বলে যে  রাসূল (ﷺ) আগামীকালের কথা বলতে পারেন, সে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করলো।’’

{তিরমিজীঃ আস-সুনানঃ কিতাবুত তাফসীর, সূরাঃ আনআম, ৫/২৬২ হাদিসঃ ৩০৬৮}


উত্তরঃ

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) এর এ তিনটি উক্তি থেকে বাহ্যিক অর্থে যা বুঝা যাচ্ছে, তা মূল বক্তব্য নয়। এ উক্তিসমূহ তিনি নিজের রায়ের উপর ভিত্তি করেই করেছেন। এ বিষয়ে কোন ‘মরফু’ হাদীছ (যা সনদের সূত্র হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছেছে। উপস্থাপন করেন নি, তিনি বরং কুরআনের আয়াতের উপর ভিত্তি করেই স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছেন।


❏ মহাপ্রভুকে দেখা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) যে রিওয়ায়েতে পেশ করেছেন, এখন পর্যন্ত এ তথ্যটি মুসলিম সমাজে সর্বজন স্বীকৃত বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।


❏ এ প্রসঙ্গে ‘মাদারেজুন নাবুওয়াত’ নসীমুর রিয়ায ইত্যাদি সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী ও আমার রচিত গ্রন্থ ‘শানে হাবীবুর রহমানের’ সূরা ওয়াননজমের’ ব্যাখ্যায় বর্ণিত তথ্যসমৃদ্ধ পর্যালোচনা দেখুন

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আমার 'প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন' বইটিতে ৪০টির বেশী হাদীস দেয়া হয়েছে- শহীদুল্লাহ বাহাদুর)।


❏ অনুরূপ, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) যে বলেছেন,  রাসূল (ﷺ) কোন কিছু গোপন করেন নি, তাঁর এ উক্তিতে প্রচারোপযোগী শরীয়তের নির্দেশাবলীর কথাই বলা হয়েছে । কেননা, খোদার অনেক নিগুঢ় রহস্য তো মানুষের নিকট ব্যক্ত করেননি।


❏ ‘মিশকাত শরীফ’ এর কিতাবুল ইলম’ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে হযরত আবু হুরাইয়া (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত আছেঃ তিনি বলেছেন,  রাসূল (ﷺ)-এর নিকট থেকে আমি (হযরত আবু হুরাইরা) দু’ধরনের জ্ঞান লাভ করেছি, এক ধরনের জ্ঞান আমি প্রচার করেছি’ দ্বিতীয় ধরনেরটা যদি আপনাদের কাছে ব্যক্ত করি’ তাহলে আপনারা আমার গলা কেটে দিবেন।

{ক. বুখারীঃ আস-সহীহঃ ১/২১৬ পৃ. হাদিসঃ ১২০

খ. খতিব তিবরিযীঃ মেশকাতঃ কিতাবুল ইলমঃ তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ ১/৭০ হাদিসঃ ২৭১}



এ কথা থেকে বোঝা গেল যে, খোদার ভেদ সম্পর্কিত তথ্যাবলী অনুপযুক্ত ব্যক্তির কাছে উদঘাটন করা হয়নি। অনুরূপ, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) যে বলেছেন, ‘আগামীকালের কথা  রাসূল (ﷺ) জানতেন না’ একথার দ্বারা সত্ত্বাগত ভাবে না জানার কথাই বলা হয়েছে। অন্যথায়, তাঁর বক্তব্য অনেক হাদীছ ও কুরআনের আয়াতের বিপরীত প্রতিপন্ন হবে। 


❏ রাসূল (ﷺ) কিয়ামত, দাজ্জাল, ইমাম মাহদী (عليه السلام), ‘হাউজে কাউছার’, শাফায়াত, এমন কি হযরত হুসাইন (رضي الله عنه) এর শাহাদত বরণ, বদরের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কাফিদের নিহত হওয়া ও তাদের নিহত হওয়ার স্থান ইত্যাদি সম্পর্কে খবর দিয়েছেন। আরও মজার ব্যাপার যে, যদি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) এর উক্তির বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা ভিন্নমতাবলম্বীদের ধ্যান ধারণাও বিপরীত হয়ে যাবে। কেননা তারাও তো অনেক অদৃশ্য বিষয়ক জ্ঞানের কথা স্বীকার করে থাকেন, অথচ এখানে সে বিষয়ের সম্পূর্ণভাবে অস্বীকৃতিই জ্ঞাপন করা হচ্ছে। আজ আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার হবে, সূর্য উদিত হবে, রাত আসবে এগুলোও তো আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য ঘটনাবলীর জ্ঞানের সাথেই সম্পৃক্ত। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (رضي الله عنه) অবশ্য হুযুরের স্বশরীরের মি’রাজের ঘটনাকেও অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এর উত্তরে বলা হয় যে, মিরাজের ঘটনা তাঁর বিবাহের আগেই সংঘটিত হয়েছিল, যার জন্য এ বিষয়টি তাঁর জ্ঞানানুভূতিতে আসেনি।



৪নং আপত্তিঃ

হযরত আয়েশা সিদ্দীকার (رضي الله عنه) গলার হার হারানো গিয়েছিল, জায়গায় জায়গায় তল্লাসী করানোর পরেও এর হদিস পাওয়া যায়নি। অবশেষে উটের নিচ থেকেই সেটি উদ্ধার করা হয়। যদি  রাসূল (ﷺ)-এর অদৃশ্য জ্ঞান থাকতো অনুসন্ধাকারী লোকদেরকে সে সময় কেন বললেন না যে, হার ওখানে আছে? অতএব বোঝা গেল যে, সে সম্পর্কে হযরত রাসূল (ﷺ) জ্ঞাত ছিলেন না।


উত্তরঃ

এ হাদীছ থেকে তাঁর না বলাটাই বোঝা যায়, না জানার ব্যাপারটি প্রতীয়মান হচ্ছে না। আর না বলার পেছনে অনেক রহস্য থাকে। সাহাবায়ে কিরামদের কেউ কেউ চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহান প্রতিপালক তা বলেন নি। তাহলে কি আল্লাহ তা’আলারও জানা ছিল না? খোদার ইচ্ছা ছিল, সিদ্দীকার (رضي الله عنه) হার হারিয়ে যাক, মুসলমানগণ ওটার তল্লাশী করতে করতে এখানে সাময়িক অবস্থান করুক, যুহরের সময় হোক; পানি পাওয়া না যাক। তখনই  রাসূল (ﷺ)-এর খেদমতে আরয করা হোক যে, তাঁরা এখন কি করবেন। এ প্রেক্ষাপটে আয়াত তায়াম্মুম নাযিল হোক। কিয়ামত পর্যন্ত ধরাপৃষ্ঠে আগমনকারী মুসলমানগণ একথাটি অনুধাবন করুক যে, তাঁরই বদৌলতে আমরা তায়াম্মুমের নির্দেশ পেলাম। যদি তখনই হারের কথা বলে দেয়া হতো, তাহলে ‘আয়াতে তায়াম্মুম’ নাযিল হতো কি জন্য? মহা প্রতিপালকের যে নয়ন কিয়ামত পর্যন্ত যাবতীয় অবস্থা অবলোকন করে, সেই নয়নের কাছে উটের নিচে চাপাপড়া কোন বস্তু গোপন থাকতে পারে কিভাবে? খোদা, মাহবুব আলাইহিস সালামের শান-মান অনুধাবন করার তৌফিক দান করুন।

+++++++++++
জা’আল হক (প্রথমাংশ)

মূলঃ হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহে আলাইহে

অনুবাদকঃ (শাহজাদা) মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আলম ও মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।

তথ্য সংযােজনঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন