জা’আল হক (প্রথমাংশ)


দ্বিতীয় অধ্যায়

হাযির-নাযির’ সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে উত্থাপিত আপত্তিসমূহের বিবরণ
-----------


১ নং আপত্তিঃ

প্রত্যেক জায়গায় ‘হাযির-নাযির’ হওয়া খোদার একটি গুণ।


❏ কুরআনে উক্ত হয়েছেঃ


 عَلَى كُلِّ شَيْئٍ شَهِيْدً


অর্থাৎ- তিনিই প্রত্যেক কিছুর সাক্ষী। 

{সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ৩৩, পারাঃ ৫}



❏ অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

 بِكُلِّ شَيْئٍ مُحِيْطُ


অর্থাৎ- তিনিই প্রত্যেক কিছুকেই পরিবেষ্টন করে আছেন। 

{সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ১২৬, পারাঃ ৫}



এমতাবস্থায় খোদা ছাড়া অন্য কারো মধ্যে এগুণ স্বীকার করা খোদার গুণে অপরকে শরীক করা হয় বৈকি।

উত্তরঃ প্রত্যেক জায়গায় ‘হাযির-নাযির’ হওয়া আদৌ খোদা তা’আলার গুণ নয়। আল্লাহ তা’আলা স্থানের সীমাবদ্ধতার গন্ডি থেকে মুক্ত।


❏ আকায়েদের কিতাবসমূহের উলে­খিত আছেঃ


لاَيَجْرِيْ عَلَيْهِ زَمَانَّ وَّلاَيَشْتَمِلُ عَلَيْهِ مَكَانٌُ


-‘‘আল্লাহর উপর কালের কোন প্রভাব নেই। কেননা, কালের প্রভাব পড়ে পৃথিবীতে, নিম্নজগতের শরীরী জীব ও বস্তুর উপর। এদেরই বয়স বা কাল নিরূপিত হয়। আর চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, হুর ও গিলমান, ফিরিশতা এমনিক, আসমানের উপর অবস্থানকারী হযরত ঈসা (عليه السلام) এবং মি’রাজের সময় হুজুর (ﷺ) কালের প্রভাব থেকে মুক্ত। অনুরূপ, কোন স্থানও খোদা তা’আলাকে পরিবেষ্টন করে না। তাই আল্লাহ তা’আলা ‘হাযির’ কিন্তু স্থানের গন্ডীর বাইরে।


❏ এজন্য কুরআনে উলে­খিতঃ


 ثُمَّ اسْتَوَي عَلَى الْعَرْشِ


(অতঃপর আল্লাহ আরশের উপর অধিষ্ঠিত হন) 

{সূরাঃ রা’দ, আয়াতঃ ২, পারাঃ ১৩}



আয়াতটিকে ‘আয়াতে মুতাশাবিহাত’ বা অবোধগম্য আয়াতসমূহের অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে। আর بِكُلِّ شَيْئٍ مُحِيْطٌُ অর্থাৎ- তিনিই সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।  ইত্যাদি আয়াতের তাফসীরে সর্বজনমান্য মুফাস্সিরগণ বলেন- عِلْمًا وَّقُدْرَةً

অর্থাৎ, খোদার জ্ঞান ও শক্তির দিক থেকেই সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।

{সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ১২৬, পারাঃ ৫}


❏ কবির ভাষায়ঃ


وهي لامكان كے مكين هوے سرعرش تخت نشين هوے

وه نبى هيں جنكے بيں يه مكان وه خدا هے جس كامكان نهيں


[প্রিয় নবী (ﷺ)ই ‘লামকানে’ অবস্থান গ্রহণকারী ছিলেন, আরশের শীর্ষে তিনি অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সেটিই হচ্ছে প্রিয় নবীর নির্ধারিত স্থান বা ‘মকানে’। খোদা তো কোন স্থানের গন্ডীতে আবদ্ধ নন।]


খোদাকে প্রত্যেক জায়গায় স্বীকার করা ধর্মহীনতা। প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যমান হওয়া খোদার রাসূলেই বৈশিষ্ট্য। আর প্রত্যেক জায়গায় ‘হাযির-নাযির’ হওয়ার গুণকে খোদার জন্য স্বীকার করা হলেও হুজুর (ﷺ) এর ক্ষেত্রে এ গুণকে অস্বীকার করা যায় না। বরং বলা চলে, হুজুর (ﷺ) এর গুণ খোদা প্রদত্ত, অচিরন্তন, সৃষ্ট ও খোদা তা’আলার নিয়ন্ত্রণাধীন। আর, খোদার ক্ষেত্রে এ গুণটি সত্ত্বাগত, চিরন্তন, কারো দ্বারা সৃষ্ট বা কারো নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এত সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ‘শির্ক’ হয় কিরূপে? জীবন, শ্রবণ, দর্শন প্রভৃতি গুণাবলী সমূহ নিজের জন্য স্বীকার করলে যেমন ‘শিরক’ হয় না, তেমনি ‘হাযির-নাযির’ হওয়ার গুণকেও হুজুর (ﷺ) এর জন্য স্বীকার করলে ‘শির্ক’ হতে পারে না।


❏ ফত্ওয়ায়ে রশীদিয়া’ প্রথম খন্ডের আল-বিদআত শীর্ষক আলোচনার ৯১ পৃষ্ঠায় উলে­খিত আছেঃ


فخر دو عالم عليه السلام كو مولود ميں حاضر جا ننا بهى غير

ثابت هےاگر باعلام الله تعالي جانتاهے تو شرك نهيں ورنه شرك هے


অর্থাৎ- সরকার দোআলম আলাইহিস সালামকে মওলুদ শরীফে ‘হাযির’ জানার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত নয় বটে, তবে খোদা প্রদত্ত শক্তির বদৌলতে তাঁকে হাযির জ্ঞান করলে ‘শির্ক’ নয়, এর অন্যথা হলে ‘শির্ক’।


একথাটুকু ‘বারাহীনে কাতেয়া’ গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায়ও উলে­খিত আছে। মওলবী রশীদ আহমদ সাহেবতো এ কথাটুকু রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন যে, খোদা ছাড়া অপর কাউকে খোদা প্রদত্ত শক্তির বদৌলতে ‘হাযির-নাযির’ জানা ‘শির্ক’ নয়। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, একথা থেকে অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রতীয়মান হয় যে, ‘ওয়াজিবুল ওযুদ’ (যার অস্তিত্ব অত্যাবশ্যকীয়) ও ‘চিরন্তন’ হওয়ার বিশেষ গুণাবলীও পয়গাম্বরদের জন্য খোদা প্রদত্ত গুণাবলীরূপে স্বীকার করা যাবে এবং সে দিক দিয়ে হুজুর (ﷺ)কেও স্রষ্টা, ‘ওয়াজিবুল ওযুদ’ (যার অস্তিত্ব অত্যাবশ্যকীয়) এ ‘চিরন্তন’ বলা যাবে। এ প্রশ্নের উত্তর উত্তর হচ্ছে, খোদা তা’আলার চারটি বিশেষ গুণ অন্য কাউকে দান করা হয় না। কারণ, সেগুলোর উপরই ‘একমাত্র উপাস্য হওয়ার বিষয়টি নির্ভরশীল। এগুলো ছাড়া খোদার অন্যান্য গুণাবলী সৃষ্টজীবের মধ্যে বিকশিত হতে পারে, যেমন শ্রবণ, দর্শন, জীবন ইত্যাদি। তবে খোদার গুণাবলীর সাথে সৃষ্টজীবের এসব গুণের যথেষ্ট প্রভেদ লক্ষ্যণীয়। মহা প্রভু আল্লাহ তা’আলার সে সব গুণ হবে সত্ত্বা্গত, অত্যাবশ্যকীয় ও অবিনশ্বর; আর মাখলুকের ওসব গুণ হবে খোদা প্রদত্ত, সম্ভবপর ও নশ্বর।


❏ কবির ভাষায়ঃ


جوهوتى خدائ بهى دينے كى قابل

خدابن كے آتاوه بنده خدا كا


 -‘খোদা হওয়ার যোগ্যতা যদি কাউকে দান করা হতো, তাহলে খোদার বান্দাই খোদা হয়ে আবির্ভুত হত।’



২নং আপত্তিঃ


❏ কুরআনুল করীম ইরশাদ করছেঃ


وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ


-‘‘আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তাঁরা নিজেদের কলম পানিতে ফেলছিলেন।’’ 

(সূরাঃ আলে ইমরান, আয়াতঃ ৪৪, পারাঃ ৩}



হযরত মরিয়ামকে পাওয়ার জন্য পানিতে কলম নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত স্থিরীকৃত হয়েছিল।


❏ সে প্রসঙ্গে উক্ত হয়েছে


وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ


-‘‘আপনি তাঁদের কাছে ছিলেন না, যখন তাঁরা তাদের নিজেদের ব্যাপারটি মীমাংসা করার ক্ষেত্রে মতৈক্য পৌঁছেছিলেন।’’ 

{সূরাঃ ইউসূফ, আয়াতঃ ১০২, পারাঃ ১৩}



❏ এ ধরনের আরো আয়াত রয়েছে। যেমনঃ


وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى


-‘‘আপনি সে উন্মুক্ত প্রান্তরের পশ্চিম প্রান্তে ছিলেন না, যখন আমি হযরত মুসা (عليه السلام) এর নিকট আমার নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম।’’

{সূরাঃ কাসাস, আয়াতঃ ৪৪, পারাঃ ২০}



وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا


-‘‘আপনি তুর পাহাড়ের পাশের্ব ছিলেন না, যখন আমি হযরত মুসা (عليه السلام) কে সম্বোধন করছিলাম।’’

{সূরাঃ কাসাস, আয়াতঃ ৪৬ঃ পারা ২০}


এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, বিগত যুগে উলে­খিত ঘটনাবলী ঘটার সময় হুজুর (ﷺ) ঘটনাস্থলে বিদ্যমান ছিলেন না। তাই পরিষ্কাররূপে বোঝা গেল যে, হুজুর (ﷺ) প্রত্যেক জায়গায় ‘হাযির-নাযির’ নন।


উত্তরঃ

‘হাযির-নাযির’ এর মানে কি, সে সম্পর্কে অঙ্গতার কারণে এ আপত্তিটি উত্থাপন করা হয়েছে। আমি আগেই আরয করেছি যে, ‘হাযির-নাযির’ এর তিন ধররেন অর্থ আছেঃ


এক, এক জায়গায় অবস্থান করে সমগ্র জগত দেখা;

দুই, এক মুহুর্তের মধ্যে সমগ্র পৃথিবী ভ্রমণ করা;

তিন, একই সময়ে কয়েক জায়গায় দৃশ্যমান হওয়া।


উলে­খিত আয়াত সমূহে বলা হয়েছে, তিনি এ পার্থিব শরীর নিয়ে ঘটনাস্থলে বিদ্যমান ছিলেন না। একথা কোথায় বলা হয়েছে যে, তিনি ঐ সমস্ত ঘটনাবলী অবলোকন করেন নি? স্বশরীরে তথায় উপস্থিত না থাকা এক কথা এবং তাঁর সে সব ঘটনা অবলোকন করা ভিন্ন কথা। এবং উপরোক্ত আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে, হে মাহবুব আলাইহিস সালাম, আপনি তথায় স্বশরীরে বিদ্যমান ছিলেন না। তবে সে সব ঘটনা সম্পর্কে আপনি অবহিত ও অবলোকনও করেছেন। এতে বোঝা যায় যে, তিনি (ﷺ) সত্য নবী। উক্ত আয়াতগুলো বরং হুজুর (ﷺ) এর ‘হাযির-নাযির’ হওয়ার বিষয়টি সপ্রমাণ করছে।


❏ সুপ্রসিদ্ধ ‘তাফসীরে সা’বীতে وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّوْر الاية এর তাফসীরে উলে­খিত আছেঃ


وَهَذَا بِالْنَّظَرِ اِلَى الْعَالَمِ الْجِسْمَانِيِّ لاَقَامَةِ الْحُجَّةِ عَلَي الْخَصْمِ وَاَمَّا بِالنَّظَرِ اِلىَ الْعَالَمِ الرُّوْحَنِيِّ فَهُوَ حَاضِرٌُ رِسَالَةَ كُلِّ رَسُوْلٍ وَمَاَ وَقَعَ مِنْ لَّدُنِ ادَمَ اِلَى اَنْ ظَهَرَ بِجِسْمِهِ الشَّرِيْفِ (سوره قصصى تفسير صاوي)


-‘‘এখানে যে বলা হয়েছে, আপনি হযরত মুসা (عليه السلام) এর সে ঘটনাস্থলে ছিলেন না, তা শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে। রূহানীভাবে তো হুজুর (ﷺ) প্রত্যেক রাসূলের রিসালাত ও হযরত আদম (عليه السلام) এর আদি সৃষ্টি থেকে শুরু করে তাঁর স্বশরীরে আবির্ভূত হওয়ার সময় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সমস্ত ব্যাপারে মওজুদ ছিলেন।’’

{ইমাম সাভীঃ তাফসীরে সাভীঃ সূরাঃ কাসাস}



❏হিজরতের দিন হুজুর (ﷺ) সত্যের প্রতীক হযরত সিদ্দীক আকবর  (رضي الله عنه) কে নিয়ে ছওর নামক গুহায় অবস্থান করছিলেন। এদিকে মক্কার কাফিরগণ উক্ত গুহার মুখে এসেই উপস্থিত। হযরত সিদ্দীক  (رضي الله عنه) অবস্থা দৃষ্টে বিচলিত হয়ে পড়লেন। এসময় হুজুর (ﷺ) ইরশাদ করেন لاَتَحْزَنْ اِنَّ اللهَ مَعَنَا (চিন্তা কর না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।)

{সূরাঃ তাওবাহ, আয়াতঃ ৪০, পারাঃ ১০}


এখানে কি এ আয়াতের লক্ষ্যার্থ এ যে, আল্লাহ তো আমাদের সাথে আছেন, কিন্তু কাফিরদের সাথে নেই? যদি তাই হয়, তাহলে বোঝা যায় যে, আল্লাহ প্রত্যেক জায়গায় মওজুদ নেই। কাফিরগণও তো এ জগতেই ছিল।


❏অনুরূপ উহুদ যুদ্ধের পর কাফিরদের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন اللهُ مَوْلَنَا وَلاَمَوْلَى لَكُمْ (আল্লাহ আমাদের মওলা, তোমাদের মওলা কেউ নেই।) 

{বুখারীঃ আস-সহীহঃ কিতাবুল মাগাজীঃ ২/৫৭৯ পৃ.}


একথা থেকে বোঝা গেল যে, খোদার রাজত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেবল মাত্র মুসলমানদের উপরই আছে, কাফেরদের উপর নেই। ‘মওলা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কার্যনির্বাহক। উক্ত কালামের অন্তর্গত বাক্য দু’টির অর্থের সমন্বয় সাধন করলে প্রথমোক্ত বাক্যের ভাবার্থ দাঁড়ায়ঃ আল্লাহ তা’আলা দয়া ও রহমত সহকারে আমাদের সাথে আছেন, আর কহর ও গযব সহকারে আছেন কাফিরদের সাথে। দ্বিতীয় বাক্যটির সারমর্ম হলো, আমাদের মওলা আছেন সাহায্যকারীরূপে, হে কাফিরগণ, তোমাদেরও মওলা আছেন বটে, তবে তোমাদের সাহায্যকারী হিসেবে নন। অনুরূপভাবে ওসব আয়াতের ক্ষেত্রেও বলা হবে যে, রাসূল (ﷺ) বাহ্যিকভাবে স্বশরীরে সে সময় তাদের কাছে উপস্থিত ছিলেন না।

++++++++++
জা’আল হক (প্রথমাংশ)

মূলঃ হযরাতুল আল্লামা আলহাজ্ব মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমতুল্লাহে আলাইহে

অনুবাদকঃ (শাহজাদা) মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আলম ও মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।

তথ্য সংযােজনঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন